৪০ বছরের কম বয়সী আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতি, কারা আছেন শীর্ষ ১০–এ

২০০৮ সালে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণ উদ্যোক্তা বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে নতুন রেকর্ড গড়েন। তিনি মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। সে বছর তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতির খেতাব পান।

এরপর ফোর্বসের বার্ষিক ওয়ার্ল্ডস বিলিয়নিয়ার্স লিস্টে ৪০ বছরের কম বয়সী ও সবচেয়ে ধনী আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতি হিসেবে গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনকে পেছনে ফেলে দেন জাকারবার্গ। মেটার প্রধান হিসেবে তিনি টানা ১১ বছর সেই অবস্থান ধরে রাখেন। এটা রেকর্ড।

তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ৪০ বছর বয়সে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে জাকারবার্গ সেই বয়সসীমা পেরিয়ে যান। এরপর এই তালিকা একাধিকবার হালনাগাদ হয়েছে। কালের নিয়মে তা হওয়ারই কথা। দেখে নেওয়া যাক, এখন এই তালিকায় কারা আছেন। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের হিসাব অনুযায়ী এ তালিকা করা হয়েছে।

এডউইন চেন, সম্পদ ১৮ বিলিয়ন ডলার

৪০ বছরের কম বয়সী সবচেয়ে ধনী আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতি হলেন সার্জ এআইয়ের ৩৮ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা এডউইন চেন। চেন ২০২০ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপ সার্জ এআই প্রতিষ্ঠা করেন। এআই প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য লেবেলিংয়ে বিভিন্ন কোম্পানিকে সহায়তা করাই এর মূল কাজ। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। গুগল ও অ্যানথ্রপিকসহ বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে ২০২৪ সালে সার্জ এআইয়ের আয় দাঁড়ায় ১২০ কোটি ডলার। এমআইটি থেকে গণিত, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও ভাষাবিদ্যায় পড়াশোনা করা চেনের দাবি, কোনো ধরনের বাইরের বিনিয়োগ ছাড়াই তিনি সার্জ এআইকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। ফোর্বসের হিসাবে, কোম্পানিটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মালিকানা তাঁর হাতে।

ওয়াং নিং অ্যান্ড ফ্যামিলি, সম্পদ ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার

ওয়াং ২০১০ সালে খেলনা কোম্পানি পপ মার্ট ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ সালে এই কোম্পানি হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের (বাজারমূল্য) এই কোম্পানির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তিনি নিজেই। পপ মার্ট মূলত ছোট ফিগারিন ও প্লাশ খেলনার জন্য পরিচিত। এসব খেলনা ‘ব্লাইন্ড বক্স’ প্যাকেজে বিক্রি হয়, অর্থাৎ ভেতরে ঠিক কী আছে, তা আগেই জানা যায় না। খরগোশের মতো চরিত্র, খাঁজকাটা দাঁত ও দুষ্টু হাসিওয়ালা লাবুবু পুতুলের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার কল্যাণে গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

প্যাট্রিক কলিসন ও জন কলিসন, সম্পদ ১০.১ বিলিয়ন ডলার

আয়ারল্যান্ডের লিমেরিকের কাছের গ্রামাঞ্চলে জন্ম এই দুই ভাইয়ের। সেখানেই তাঁদের বেড়ে ওঠা। তাঁদের মা–বাবা হ্রদের পাড়ে হোটেল চালাতেন। সেই দুই ভাই ২০১০ সালে যৌথভাবে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইপ প্রতিষ্ঠা করেন। এমআইটিতে একসঙ্গে পড়ার সময়ই তাঁদের মাথায় এই কোম্পানির ধারণা আসে। বর্তমানে প্যাট্রিক স্ট্রাইপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং জন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্ট্রাইপের মূল্যায়ন হয় ৯১ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ১৫০ কোটি ডলার।

জাস্টিন সান, সম্পদ ৮.৫ বিলিয়ন ডলার

জাস্টিন সান ২০১২ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়েন। তিনি বিটকয়েনের প্রাথমিক ব্যবহারকারীদের একজন। এরপর তিনি ট্রন ব্লকচেইনকে কেন্দ্র করে বিশাল ক্রিপ্টো–সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন; ট্রন প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৭ সালে। ২০২৪ সালে সান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সান ও তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান বাজার কারসাজি-সংক্রান্ত তদন্ত স্থগিত করে।

ক্লিফ ওবরেখট ও মেলানি পারকিন্স, সম্পদ ৭.৬ বিলিয়ন ডলার

ওবরেখট ও পারকিন্স স্বামী-স্ত্রী। ২০১৩ সালে আরেক বিলিয়নিয়ার ক্যামেরন অ্যাডামসের সঙ্গে মিলে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ডিজাইন সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম ক্যানভা চালু করেন। ওবরেখট ও পারকিন্স যথাক্রমে প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা দানধ্যানের পরিকল্পনা করেছেন। ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে তাঁরা নিজেদের মালিকানার ৮০ শতাংশের বেশি অলাভজনক ক্যানভা ফাউন্ডেশনে হস্তান্তর করবেন। গত আগস্ট মাসে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ক্যানভার মূল্যায়ন করেছেন ৪২ বিলিয়ন ডলার।

ভ্লাদ তেনেভ, সম্পদ ৬.৬ বিলিয়ন

তেনেভের জন্ম বুলগেরিয়ায়, যদিও তিনি বড় হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে। তাঁর মা–বাবা উভয়েই বিশ্বব্যাংকের কর্মী ছিলেন। ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও আরেক বিলিয়নিয়ার বাইজু ভাটের সঙ্গে মিলে তিনি বিনা কমিশনে শেয়ার লেনদেনের অ্যাপ রবিনহুড মার্কেটস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২১ সালে এই কোম্পানি নাসডাকে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এই কোম্পানির বাজার মূলধন ১০৮ বিলিয়ন ডলার। তেনেভ রবিনহুডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। সম্প্রতি কোম্পানিটি টোকেনাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগে জোর দিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কাই হাইয়ু, সম্পদ ৬ বিলিয়ন

২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শাংহাইভিত্তিক অনলাইন গেমস ডেভেলপার মিহোইয়োর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কাউ হাইয়ু। ২০২৩ সালে তিনি উভয় পদই সহপ্রতিষ্ঠাতা লিউ ওয়েইর কাছে হস্তান্তর করেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ারে তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কোম্পানিটির জনপ্রিয় গেম জেনশিন ইমপ্যাক্টে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড়েরা ৫০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ খরচ করেছেন।

তৈমুর তারলভ, সম্পদ ৫.৯ বিলিয়ন ডলার

মস্কো স্টেট টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় তারলভ ২০০৮ সালে কাজাখস্তানভিত্তিক রিটেইল ব্রোকারেজ ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ফ্রিডম হোল্ডিং প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৯ সালে এই কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এই কোম্পানির বাজার মূলধন প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। ফ্রিডম হোল্ডিং পোস্টের মাধ্যমে সোভিয়েত নাগরিকেরা মার্কিন ও ইউরোপীয় স্টক এক্সচেঞ্জে প্রবেশাধিকার পায়। এই কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ।

একটি জায়গায় ২০২১ সালের দল থেকে আজকের দলটি পিছিয়ে। সেটি হলো, মোট সম্পদের অঙ্কে। ৪০ বছরের কম বয়সী ও আত্মপ্রতিষ্ঠিত ধনীদের তালিকায় শীর্ষে থাকা এডউইন চেনের সম্পদ ২০২১ সালে জাকারবার্গের সম্পদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে এখন যে ৭১ জন ধনী এই আত্মপ্রতিষ্ঠিত শতকোটিপতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তাঁদের মোট সম্পদ ২০২১ সালের দলটির চেয়ে অনেকটাই কম।