যুক্তরাষ্ট্রে ধনীরা কেন আরও ধনী হচ্ছেন

নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে অবস্থিত ‘নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ’-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তিফাইল ছবি। এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই দুই ভাগে বিভক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভাজনটি আর কেবল রেখায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সম্পদের ৩২ শতাংশ ছিল শীর্ষ ১০ ভাগ মানুষের হাতে। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৬৮ শতাংশই এখন এই মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের দখলে।

অর্থনীতির ভাষায় এ অদ্ভুত পরিস্থিতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কে-শেপড ইকোনমি’ বা কে-আকৃতির অর্থনীতি। অর্থাৎ ইংরেজি বর্ণমালার ‘কে’ অক্ষরের মতো এর এক প্রান্তের মানুষ (ধনীরা) তরতর করে ওপরে উঠে যাচ্ছে, আর অন্য প্রান্তের বিশাল জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে গত তিন বছরের মূল্যস্ফীতি সংকট এ ব্যবধানকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তবে প্রশ্ন হলো, কেন শুধু ধনীরাই আরও ধনী হচ্ছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আবাসন, শেয়ারবাজার আর জীবনযাত্রার ভিন্নতায়।

সম্পদের ‘জাদুর কাঠি’ যখন ধনীদের হাতে

বিগত ৩ বছরে সব স্তরের মার্কিন নাগরিকের সম্পদ কিছুটা বাড়লেও সেই বৃদ্ধির হার আকাশ-পাতাল। তথ্য বলছে, শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর নিট সম্পদ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। অথচ মধ্যবিত্ত ৪০ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছে ১০ শতাংশের কম। কেন এ বৈষম্য? কারণ, ধনীরা অর্থ শুধু জমান না, তাঁরা ‘বিনিয়োগ’ করেন।

আবাসন ও শেয়ারবাজারের একাধিপত্য

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন আর শেয়ারবাজারের চাবিকাঠি মূলত ধনীদের হাতে। দেশের তিন-চতুর্থাংশ শেয়ার ও অর্ধেকের বেশি বাড়ির মালিকানা এখন শীর্ষ ২০ শতাংশ মানুষের হাতে।

গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির দাম কল্পনাতীতভাবে বেড়েছে। সুদের হার বেশি হওয়ায় সাধারণ বা নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে এখন আর নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ মহামারির ঠিক পরে যখন সুদের হার কম ছিল, তখন ধনীরা তাঁদের মর্টগেজ রিফাইন্যান্স (বিদ্যমান ঋণের বিপরীতে নতুন ঋণ নেওয়া) করে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি ডলারের বাড়তি সুবিধা পকেটে ভরেছেন।

সর্বশেষ ৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের সঞ্চিত নগদ অর্থের মান ১ শতাংশের বেশি বাড়েনি। সেখানে শেয়ারবাজারের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক (যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির সূচক) বেড়েছে প্রায় ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে যাঁদের হাতে বিনিয়োগ করার মতো সম্পদ ছিল, তাঁরা কয়েক গুণ বেশি লাভবান হয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ৩ বছর আগে কেউ যদি ১ লাখ ডলার ব্যাংকে জমা রাখতেন, আজ সেটি হয়তো ১ লাখ ১ হাজার ডলার হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি সেই পরিমাণ ডলার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতেন, তবে এখন তাঁর সম্পদের পরিমাণ হতো প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ডলার।

অর্থাৎ যাঁরা সচ্ছল এবং যাঁদের অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করার ক্ষমতা আছে, তাঁরা শেয়ারবাজারের এ উত্থানের ফলে কয়েক গুণ বেশি ধনী হয়েছেন।

মূল্যস্ফীতি ভোগায় গরিবদের

মূল্যস্ফীতি সবার পকেটে সমান টান দেয় না। আয়ের স্তরভেদে দ্রব্যমূল্যের প্রভাব ভিন্ন হয়। নিম্ন আয়ের মানুষকে তাঁদের আয়ের বড় অংশ খরচ করতে হয় দৈনন্দিন খাবার আর ভাড়ার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে।

মিনিয়াপোলিস ফেডের মতে, ২০০৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৫৭ শতাংশ, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধির হার ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির বাজারেও ধনীদের ক্রয়ক্ষমতা খুব একটা টলেনি।

ভোগবিলাসেও দুই মেরু

আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো খরচের ধরন। ২০২৩ সালের মূল্যস্ফীতিজনিত সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের মানুষেরা খাবার বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সব খরচ কমিয়ে দেন। কিন্তু ধনীদের বিলাসিতা থামেনি।

যেসব মার্কিনের বার্ষিক আয় ৪০ হাজার ডলারের কম, তাঁরা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে তাঁদের খরচ কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে এসে তাঁরা কোনোমতে টিকে থাকার মতো অবস্থায় ফিরতে পেরেছেন। গত তিন বছরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার পর এই নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।

সেখানে সচ্ছল পরিবারগুলোর (১ লাখ ২৫ হাজার ডলার বা তার বেশি আয়) খরচ বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চবিত্তের এই লাগামহীন খরচ অনেক সময় পরোক্ষভাবে বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

এক অসম লড়াই

আমেরিকার এই ‘কে-শেপড’ অর্থনীতি প্রমাণ করছে যে সম্পদ থাকলেই নতুন সম্পদ গড়া সহজ। ধনী মার্কিনদের কাছে কেবল যে বেশি অর্থ আছে তা-ই নয়, বরং বিত্তহীনদের তুলনায় তাঁদের সম্পদ বাড়ানোর সুযোগও অনেক বেশি।

যাঁদের হাতে পুঁজি আছে, তাঁরা আবাসন আর শেয়ারবাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও অর্থ বানাচ্ছেন। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি আর আকাশচুম্বী সুদের চাপে সাধারণ মানুষ সে প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগই পাচ্ছেন না। এই অসম লড়াইয়ে ধনীরা কেবল এগিয়েই যাচ্ছেন না, তারা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরের এক উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছেন।