দাহরানের সমতল ভূমির নিচে ১৯৩০-এর দশকে তেলের আবিষ্কার বেদুইনদের দেশ সৌদি আরবকে পাল্টে দিয়েছিল। রাজতন্ত্র শাসিত গভীর ধর্ম বিশ্বাসের এই দেশটির হাতে তখন চলে আসে ‘কালো সোনা’, যার দুনিয়াকেই পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু সেই ক্ষমতার কোনো নিশ্চয়তা আজ আর নেই।

প্রায় শতবর্ষ পরে সৌদি রাজতন্ত্রকে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সময় পাল্টেছে, পরিবর্তন ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব জ্বালানি তেল থেকে সরে যাচ্ছে। সৌদি আরবের একটি তরুণ প্রজন্ম আরও সুযোগের সন্ধান করছে, আর বাদশাহ হতে উদ্‌গ্রীব একজন তাঁর দেশের পুরো ভাবমূর্তিই পাল্টে দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সবকিছুই করা হচ্ছে একটি মিশনকে সামনে রেখে—সৌদি আরবকে আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধিশালী করা।

এই পরিকল্পনার শিরোনাম ভিশন ২০৩০। এই দশকের শেষ নাগাদ এর মাধ্যমে সৌদি আরব তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এক. এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যা আর তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়। দুই. প্রায় চার কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। তিন. বিশ্ব মঞ্চে দেশটির অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা।

লন্ডনে ফরেন পলিসি সেন্টারের সিনিয়র গবেষক সাইমন ম্যাবন বলেন, ‘এটা কেবল অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার বিষয় নয়। বরং এটা পুরো সমাজের রূপান্তর, যার উদ্দেশ্য হলো এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যা আধুনিক বিশ্বের যেকোনো চ্যালেঞ্জের প্রতি সাড়া দিতে সক্ষম।’

সাত বছর আগে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করা হয়েছিল। অর্ধেক সময় এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে। সুতরাং হাতে সময় কম। এর মানে হলো দেশটিকে আরও সক্রিয় হতে হবে অথবা তাদের ধুলায় পড়ে থাকতে হবে।

ভিশন ২০৩০ কী
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মস্তিষ্কপ্রসূত বিশাল পরিকল্পনা ভিশন ২০৩০। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির সহায়তায় ৩৭ বছর বয়স্ক যুবরাজ এই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন। এর অনেক অংশ রয়েছে, যারা কিছু কিছু আবার ‘গিগাপ্রজেক্ট’, অর্থাৎ বিশাল কর্মযজ্ঞের ব্যাপার রয়েছে এখানে।

এসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ‘নিওম’। দেশটির উত্তর-পশ্চিম এলাকায় এর আওতায় গড়ে তোলা হবে একটি অত্যাধুনিক শহর, যার নাম ‘দ্য লাইন’। এই মেগাসিটি তৈরিতে খরচ হবে এক ট্রিলিয়ন ডলার বা এক লাখ কোটি ডলার।

শুরুর দিকের নকশায় দেখা গেছে, এটি হবে মরুর বুকে কাচে তৈরি কাঠামো, যা প্রস্থে ৬৫০ মিটার আর দৈর্ঘ্যে ১০০ মাইল। সৌদি আরব বলেছে, এই শহরে গাড়ি চলবে না, জ্বালানি আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। শহরে বাস করবে ৯০ লাখ মানুষ, যাদের যেকোনো সেবা পেতে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটতে হবে।

অন্য কথায়, দ্য লাইন হবে সৌদি আরব ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে, যা কিছু অর্জন করতে চায়, তা—অর্থাৎ তেল-পরবর্তী ভবিষ্যৎ, এমন বাসস্থান নির্মাণ, যেখানে থাকবে অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎমুখী শহরের এমন মান নির্ধারণ, যা পুরো দুনিয়া অনুসরণ করবে।

ভিশন ২০৩০-এর আওতায় ২০টির বেশি প্রকল্প আছে। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগরের তীরে অবকাশযাপন কেন্দ্র স্থাপন এবং কিদিয়া নামে এমন একটি শহর নির্মাণ, যা হবে শিল্পকলা ও বিনোদনের রাজধানী। মোদ্দাকথা, সৌদি আরবকে গড়ে তোলা হবে এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে সব নাগরিকের কাজ থাকবে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অর্থায়ন করা হচ্ছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সম্পদ তহবিল থেকে, যেটিকে বলা হয় পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড। এর আওতায় ৭০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই তহবিল থেকে সারা বিশ্বেই অর্থ খরচ করা হচ্ছে। সফটব্যাংকের ভিশন ফান্ডের পেছনে ঢালা হয়েছে চার হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এর বাইরে বিনিয়োগ পেয়েছে নিউ ক্যাসল ফুটবল ক্লাব, টেসলার প্রতিদ্বন্দ্বী লুসিড, গলফ ও বিভিন্ন ইক্যুইটি তহবিল।

এই তহবিল পরিচালনা করেন যুবরাজ মোহাম্মদ ও তহবিলের গভর্নর ইয়াসির ওসমান আল-রুমাইয়ান। বিশ্বে বড় বড় ব্র্যান্ডের পেছনে অর্থ ঢেলে এই তহবিল আশা করছে যে এর বিনিময়ে ভালো মুনাফা অর্জন করা যাবে, আর পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা বিনিয়োগের বিনিময়ে সৌদি আরবে পাল্টা বিনিয়োগ করবেন।

আরও পড়ুন

সৌদি ক্রীড়ায় বিপুল অর্থ ঢেলে মোহাম্মদ বিন সালমান কী চান

সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ। গেল বছর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো বিস্ময়কর পরিমাণ মুনাফা পেয়েছে ১৬ হাজার ১০০ কোটি ডলার।

কিন্তু পুরো বিশ্ব যেহেতু কার্বনহীন জ্বালানির দিকে যাচ্ছে, তাই সৌদির রাজকীয় পরিবার জানে যে তেল বহির্ভূত আয় আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। সে কারণে তারা দেশ ও বিদেশে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তাদের লক্ষ্য, ভিশন ২০৩০-এর আওতায় তেল বহির্ভূত রপ্তানি জিডিপির ১৬ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।

সাফল্য আসবে সেই নিশ্চয়তা নেই
সৌদি আরবের এত চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভালো কোনো ফলাফল নিয়ে আসবে কম না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত মিশ্র ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, গত বছর জি২০ দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের জিডিপি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়েছে। বেকারত্বের হার কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। চলতি দশক শেষ হওয়ার আগেই নারী কর্মসংস্থান ৩০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে গেছে।

ফরেন পলিসি সেন্টারের গবেষক সাইমন ম্যাবন বলেন, দেশটির বেশির ভাগ মানুষ যুবরাজকে সমর্থন করেন। এর কারণ, তাঁর বিশাল পরিকল্পনা। ‘তরুণ সৌদিদের সাথে কথা বললেই আপনি বুঝতে পারবেন যে তিনি তাদের মধ্যে কতটা জনপ্রিয়,’ বলেন তিনি।

তবে ইয়েমেনে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিডলইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেরাল্ড ফিয়েরস্টেইন মনে করেন, যুবরাজ সফল হবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তিনি বলেন, এটা মূলত রিয়াদ, জেদ্দা এবং দাহরানের তরুণ প্রজন্ম, যারা ভিশন ২০৩০ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি গ্রামের দিকে তাকান, সেখানকার মানুষ একই রকম অনুপ্রাণিত না-ও হতে পারে।

সাইমন ম্যাবন তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, যুবরাজ মোহাম্মদের একটি বড় সক্ষমতার পরীক্ষা হবে পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিকায়ন কর্মসূচি, তিনি কীভাবে ইসলামের আওতায় বৈধতা দেবেন, সেই বিষয়টি। তিনি বলেন, সৌদি আরব যুগ যুগ ধরে গভীরভাবে রক্ষণশীল একটি দেশ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাটাম হাউসের ফারিয়া আল-মুসলিমি অবশ্য সামাজিক সংকটের দিকে নজর দিতে বলছেন। তিনি বলেন, নিওমের জন্য বেদুইনদের জায়গা ছাড়তে হচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কারণে সাধারণ সৌদিদের রাজতন্ত্রের প্রতি একধরনের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

তবে এত ত্যাগের পর ওই সব প্রতিশ্রুতি পালনে যদি রাজপরিবার ব্যর্থ হয়, তাহলে তা সমস্যা ডেকে আনতে পারে। আল-মুসলিমি বলেন, ‘মানুষ সবকিছু ভুলে যেতে ও ক্ষমা করতে পারে, যদি ফলাফল ভালো হয়। যদি না হয়, তাহলে বিষয়টি সহজ হবে না। এতে ফল উল্টো হতে পারে।’

অন্যদিকে ভিশন ২০৩০ আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এর কারণ হলো, দুটি দেশ একই অঞ্চলে অর্থনীতির মুকুট নিজেদের মাথায় পরতে চাইছে। আবার সৌদি আরব যে বিপুল অর্থ খরচ করছে, সেই বিনিয়োগ থেকে সুবিধা পেতে বছরের পর বছর গড়িয়ে যেতে পারে।

আল-মুসলিমি যেমনটা বলছেন, ‘এমন কোনো গ্যারান্টি নেই যে এসব মেগা প্রজেক্ট প্রত্যাশামতো কাজ করবে। এটা একটা বিশাল ঝুঁকি।’

ব্লুমবার্গের সংবাদে বলা হয়েছে, বিশ্ব আর্থিক বাজারের উত্থান-পতনের কারণে গত বছর সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার লোকসান দিয়েছে।

এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করতে পারে বাকি বিশ্ব সৌদি আরবকে কীভাবে দেখে তার ওপর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সৌদি আরবে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সুতরাং পশ্চিমা ব্যবসা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

তবে ভিশন ২০৩০-এ যে বিশালত্ব ও চাকচিক্য, তা বাইরের বিশ্বকে এরই মধ্যে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে সাফল্যের একটি চাবিকাঠি এটিই হতে পারে। সৌদিরা যুবরাজ মোহাম্মদের ওপর ভরসা করে বসে আছেন। তাঁদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে তিনি এটা করতে পারবেন।