যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে শতাধিক জাহাজ, কারা যেতে পারছে?

হরমুজ প্রণালিছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। চলতি মার্চ মাসে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে ১০০টির কম জাহাজ চলাচল করেছে।

তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই এমন চিত্রই পেয়েছে। যদিও এ সময় ইরানি বাহিনী বেশ কিছু জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবু কিছু জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এই ব্যস্ততম নৌপথে চলাচল করছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছিল, প্রতিদিন প্রায় ১৩৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ। তবে শিপিং বিশ্লেষক কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৯টি জাহাজ এই সরু প্রণালি অতিক্রম করেছে। তার মানে দিনে গড়ে মাত্র ৫-৬টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাই এসব জাহাজের যাত্রাপথ এবং তারা যে ঝুঁকি নিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজের প্রায় এক–তৃতীয়াংশের সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি জাহাজ ইরানের পতাকাবাহী। বাকিগুলো ইরানের তেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এ ছাড়া ৯টি জাহাজের মালিকানায় রয়েছে চীনা কোম্পানি। আর ৬টি জাহাজের গন্তব্য ছিল ভারত।

বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, গ্রিক কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন জাহাজসহ ইরানসংশ্লিষ্ট নয় এমন বেশ কয়েকটি জাহাজও দেশটির বন্দরগুলোয় ভিড়েছে। কিছু জাহাজ প্রণালি সফলভাবে অতিক্রম করলেও, তারা সাধারণত যে পথ ব্যবহার করে, তার চেয়ে দীর্ঘ পথ পারি দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। একটি পাকিস্তানি পতাকাবাহী তেল ট্যাংকারের ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজটি প্রচলিত মধ্যপথের পরিবর্তে ইরানি উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে যাত্রা করেছে।

হরমুজ প্রণালির কাছে আটকে থাকা কিছু জাহাজ। ১১ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রতিরক্ষা থিঙ্কট্যাংক র‍্যান্ড করপোশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক ব্র্যাডলি মার্টিন বিবিসিকে জানিয়েছেন, জাহাজটি সম্ভবত ইরানের কিছু নির্দেশনা মেনে চলছিল। তিনি বলেন, জাহাজটির পথ পরিবর্তন মাইন থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে অথবা ইরানি কর্মকর্তারা জাহাজটিকে সহজে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম অ্যানালিটিকসের মিশেল উইজে বকম্যান বলেছেন, জাহাজগুলোকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করার মাধ্যমে তারা ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা এবং তেহরানের সামুদ্রিক নিয়মের আওতায় পড়ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার অনুমান, হামলা ও মাইন পেতে রাখার ভয়ের মাধ্যমে প্রণালিটি বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। সে কারণেই সবাই আন্তর্জাতিক নেভিগেশন চ্যানেল ব্যবহার না করে ইরানের আঞ্চলিক উপকূল ঘেঁষে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের মাইকেল কনেলও বলেন, জাহাজগুলো ভিন্ন পথ নিচ্ছে। সম্ভবত ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে যে নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করলে নিরাপদ থাকবে।

জাহাজ চলাচলের চার হুমকি
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার খবর যাচাই করা হয়েছে। সব কটি সরাসরি হরমুজ প্রণালির আশপাশে ঘটেনি।

১১ মার্চ থাই পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘মায়ুরি নারি’ প্রণালি পার হওয়ার সময় দুটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৩ ক্রুর মধ্যে তিনজন নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা তখন ইঞ্জিন রুমে আটকা পড়েছিলেন। বেঁচে যাওয়া ক্রুরা বিস্ফোরণের পরে আতঙ্কিত হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

একই দিনে গ্রিক মালিকানাধীন ‘স্টার গ্উইনেথ’ ও মার্কিন মালিকানাধীন ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ জাহাজও হামলার শিকার হয়। এমটি সেফসি বিষ্ণুর মালিক বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না। ইরাক উপকূলে নোঙর করা অবস্থায় একজন নিহত হন। জাহাজের ২৮ ক্রুকে বাঁচাতে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কিংস কলেজ ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের অরুণ ডসন বলেন, ড্রোন, মিসাইল, ফাস্ট অ্যাটাক বোট ও সম্ভাব্য মাইন—এই সম্মিলিত হুমকি গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। তিনি যোগ করেন, একই সময়ে আকাশ ও সমুদ্র থেকে আক্রমণ হলে মাইন খুঁজে বের করা ও নিষ্ক্রিয় করা কঠিন হবে।

ইরান প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থানও তাদের সুবিধার জন্য। প্রণালিটি সরু, অগভীর ও পাহাড়ি উপকূলযুক্ত। এটি ইরানকে উঁচু স্থান থেকে হামলা করার সুযোগ দেয়, যা জাহাজের প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় কমিয়ে দেয়।

অনেকে জাহাজের ট্র্যাকিং সিস্টেম (এআইএস) ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করছে। কেপলারের বিশ্লেষক দিমিত্রিস অ্যামপাটজিডিস বলেন, বেশির ভাগ জাহাজ ট্র্যাক বন্ধ করে চলাচল করছে। ওমান উপসাগরে প্রবেশের সময় ট্র্যাকার বন্ধ হলে জাহাজগুলো মানচিত্রে অদৃশ্য হয়ে যায়, কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর ভিন্ন স্থানে আবার দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্লেষকেরা ম্যানুয়াল যাচাইকরণ এবং স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে সব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।’