ভারতে বেড়েছে কুইক কমার্সের ব্যবসা, তবে কি টিকে থাকতে পারবে

ভারতের নয়াদিল্লির একটি বাজার এলাকায় কুইক কমার্স প্রতিষ্ঠান সুইগির গ্রোসারি গুদামের বাইরে অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মীরাছবি: রয়টার্স

ভারতের খুচরা বিক্রয় বা রিটেইল খাতে নীরবে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভারতে বেশ দাপটের সঙ্গে এগিয়ে চলছে ‘কুইক কমার্স’।

মাত্র ১০ মিনিটে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এই ‘অতি দ্রুত’ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ভারতের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এখন টাটা, আইটিসি বা ডাবরের মতো বড় বড় কোম্পানির ডিজিটাল বিক্রির প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে কুইক কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো।

ভারতে কুইক কমার্সের শুরুটা হয়েছিল করোনা মহামারি সময়। সে সময় করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের কারণে সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটে। তখন বিভিন্ন এলাকায় নিত্য ও জরুরি পণ্য সরবরাহের জন্য ছোট ছোট ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। খুব দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠান বাসা পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেয়। এতে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় প্ল্যাটফর্মগুলো। গত কয়েক বছরে সে জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।

বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় কয়েকটি কুইক কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ব্লিনকিট, জেপটো কিংবা সুইগি ইনস্টামার্টের মতো প্রতিষ্ঠান। প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বড় বড় ব্র্যান্ডের আয়ের মূল খুঁটিতে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে আইটিসি, টাটা কনজিউমার বা পার্লের মতো বড় কোম্পানিগুলোর মোট অনলাইন বিক্রির ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশই আসছে এসব কুইক কমার্স থেকে। মাত্র এক বছর আগেও এ হার ছিল অর্ধেকের কম।

ডাবুর ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের অনলাইন বিক্রির অর্ধেক কুইক কমার্স থেকে এলেও চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশে। ব্রিটানিয়া বা টাটা কনজিউমারের ক্ষেত্রেও এ হার ৭০ শতাংশের ওপরে।

কেন কুইক কমার্সের জয়জয়কার

ইকোনমিক টাইমস বলছে, ভারতীয়দের কেনাকাটার মনস্তত্ত্বকে দারুণভাবে ধরতে পেরেছে এসব প্ল্যাটফর্ম। আমাজন বা ফ্লিপকার্টে সাধারণত মানুষ বড় বড় অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু মানুষ এখন দৈনন্দিন সাধারণ গৃহস্থালি পণ্যের জন্যও সশরীর দোকানে না গিয়ে অ্যাপে অর্ডার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এই ‘তাৎক্ষণিক’ প্রয়োজনগুলো মেটাচ্ছে কুইক কমার্স।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, ১০ মিনিটে পণ্য পাওয়ার আশায় ক্রেতারা এখন দামের চেয়ে সুবিধার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। ফলে কোম্পানিগুলো অনায়াসেই তাদের দামি বা প্রিমিয়াম পণ্যগুলো এসব প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করতে পারছে।

চ্যালেঞ্জও আছে

বিক্রির পরিসংখ্যান পাহাড়সম হলেও কুইক কমার্সের পথ কিন্তু খুব একটা মসৃণ নয়। পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য ছোট ছোট গুদাম বা ‘ডার্ক স্টোর’ পরিচালনা করতে পানির মতো টাকা খরচ হচ্ছে। এ ব্যবসায় লাভের মার্জিন খুব কম হওয়ায় পুঁজি হারানোর ভয়ও থাকছে সব সময়।

এ ছাড়া ১০ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়ার এ অসম্ভব প্রতিযোগিতার কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। ডেলিভারি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং ছোট ছোট হাজার হাজার ট্রিপের কারণে পরিবেশদূষণ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে পাড়ার পরিচিত ‘কিরানা স্টোর’ বা মুদিদোকানগুলো। কুইক কমার্সের দাপটে অনেক ছোট দোকান ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে

বিশ্বের অনেক দেশে কুইক কমার্স মডেল ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারত এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুইক কমার্সের এ জোয়ার স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কারণ, মানুষের ধৈর্যহীনতা কোম্পানিগুলোর লাভ বৃদ্ধি করলেও ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ক্রেতাদের আচরণ বদলে যেতে পারে। তাই ঝুঁকি এড়াতে বড় কোম্পানিগুলো কেবল ১০ মিনিটের ডেলিভারির ওপর নির্ভর না করে চিরাচরিত বাজার ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।