বৈশ্বিক আর্থিক বাজার স্থিতিশীল থাকলেও ঝুঁকি আছে, চাপে দুর্বল অর্থনীতির দেশ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)ছবি: রয়টার্স

বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগা যাবে না বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মঙ্গলবার সংস্থাটি বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারের ব্যাপক দরপতন, সরকারি বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি কিংবা সাইবার হামলার মতো ঘটনা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। এখন পর্যন্ত বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে কোনোটি বড় আকার ধারণ করলে ঋণের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তখন ভাটা পড়তে পারে বিনিয়োগে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে আজ মঙ্গলবার। এতে বলা হয়েছে করপোরেট খাতের ভালো আয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে এআই খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। এ সবকিছুই বিশ্ববাজারের জন্য সহায়ক। এই স্থিতিশীলতার আড়ালে বেশ কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিষয়টা হলো এসব দুর্বলতার সঙ্গে নতুন করে কোনো ধাক্কা এলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সামগ্রিক নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ এখন পর্যন্ত তা কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছে। তবে সংস্থাটি বলছে, এআই খাতে এত বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। সেখান থেকে যত সুফল আসবে ধারণা করা হয়েছিল, ততটা আসবে না।

উচ্চ সুদহারে বাড়তে পারে ঋণের খরচ

বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্বেগের বড় কারণ সরকারি ঋণের চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ালে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—দুই পক্ষেরই ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ, সরকারের আর্থিক ঘাটতি ও বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড ইস্যুর কারণে বন্ডের সুদহার বেড়ে যেতে পারে। বিনিয়োগকারীরা বন্ড থেকে বেশি মুনাফা চাইলে সরকারকে ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। এতে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ শোধ করতে যদি নতুন ঋণ নিতে হয়, তার ব্যয়ও বাড়তে পারে।

আইএমএফ বলেছে, সরকারি বন্ডের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব সমগ্র আর্থিক বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সুদের হার বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তখন তারা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে। আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি চাপে পড়ে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে।

বৈদেশিক ঋণে বেশি ব্যয় হতে পারে

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ নির্ভর করে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর—বাজারের সাধারণ সুদহার ও ঋণগ্রহীতা দেশের ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেশি থাকলে অন্য দেশগুলোকেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হতে পারে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণঝুঁকি বিবেচনায় অতিরিক্ত সুদ যোগ হয়।

আইএমএফের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুদের ব্যবধান কম থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার মোট খরচ এখনো বেশি। আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে। আইএমএফের হিসাবে, ২০০৭ সালের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। অর্থাৎ ঝুঁকির জন্য অতিরিক্ত সুদ কম হলেও মূল সুদহার বেশি থাকায় ঋণের মোট খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দেশকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা এর চেয়ে অতিরিক্ত যদি ৩ শতাংশ সুদ দাবি করেন। তাহলে ওই দেশের ঋণের মোট সুদহার হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের ঋণ

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ হিসাব সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ মিলিয়ে করা হয়েছে। এই ঋণ তার আগের তিন মাস জানুয়ারি–মার্চের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের সুবিধা হলো বিদেশি ঋণের বড় অংশই বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে পাওয়া দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। এখানে বাণিজ্যিক ঋণের পরিমাণ কম। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়লে বাণিজ্যিক ঋণের পরিমাণও বাড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বৈশ্বিক অর্থায়নের উৎস সংকুচিত হলে বা ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকতে পারবে না।