যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় অগ্রগতি কম, আবার বাড়ছে তেলের দাম

ছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এখনো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের বন্দর অবরোধ করে রেখেছে এবং অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতেও নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওই অঞ্চল দিয়ে তেলসহ পণ্য পরিবহনের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে আছে। খবর আল–জাজিরার।

এ রকম অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা চলছে। আগামী জুন মাসে সরবরাহ হবে এমন ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বৃহস্পতিবার বেড়ে এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ দশমিক ৪১ মার্কিন ডলারে উঠেছে, যা ২০২২ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ। আজ শুক্রবার অবশ্য তাৎক্ষণিক বেচাকেনায় প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৮৯ সেন্ট বেড়ে ১১১ দশমিক ২৯ ডলার হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এ সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।

৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে বলেন, দ্রুত কোনো সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

ইসমাইল বাঘাই আরও বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী যে–ই হোক না কেন, স্বল্প সময়ে ফল পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।’

ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দেবে, যার মধ্যে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

আজ শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে ইরানের কোনো একতরফা ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করা যায় না।

‘গুরুত্বপূর্ণ ধমনি’

বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হয়। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে।

এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এ জলপথে সরবরাহ বিঘ্ন বছরের মাঝামাঝি সময়ের পরও অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও চরম খাদ্যসংকটে পড়বে।

গতকাল বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ ধমনিতে (হরমুজ প্রণালি) যত বেশি বাধা থাকবে, ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তত কঠিন হয়ে যাবে।’

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা গত বুধবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ইরানের বন্দর অবরোধ দীর্ঘমেয়াদি হলে তার প্রভাব কমানোর উপায় খুঁজতে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ও তেল কোম্পানির নির্বাহীরা বৈশ্বিক তেলবাজার স্থিতিশীল রাখতে নেওয়া পদক্ষেপ এবং প্রয়োজন হলে কয়েক মাস অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন, যাতে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রভাব কমানো যায়।

গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থসহ জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। মার্কিন ভোক্তাদের জীবনে এ যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে কমানো যায়, সেটিই ছিল আলোচনার মূল বিষয়। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ওই বৈঠক কার্যত হরমুজ প্রণালির বন্ধ থাকা আরও দীর্ঘায়িত হওয়া এবং এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেলের দাম ওঠানামা করছে। সংঘাতের কারণে কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে আছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া অন্তত চারটি জাহাজ মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক ওঠানামা সত্ত্বেও সংঘাতের আগের তুলনায় তেলের দাম এখনো অনেক বেশি। ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে নেমেছিল; ৮ এপ্রিল ইরানের ওপর হামলা সাময়িকভাবে স্থগিতের কথাও জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত ১২ দিনে অবরোধ অব্যাহত থাকায় তেলের দাম আবার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

এদিকে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও তেল রপ্তানি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে। রিয়ালের মান নেমেছে রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে। গত সপ্তাহে ইরান সরকার জানায়, যুদ্ধের কারণে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।