কতটা গভীর হলো সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক

এ বছরের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের রোববারে প্রচণ্ড গরমের এক রাতে রিয়াদে বসেছিল আড়ম্বরপূর্ণ এক উৎসব। সৌদি আরবের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সারাজ ব্যাংকোয়েট হলে আয়োজন করা হয় ওই উৎসবের।

খোলা তলোয়ার নিয়ে যোদ্ধার বেশে নেচেছিলেন পুরুষেরা, যাকে বলা হয় আরদাহ। একজন নেচেছিলেন বিখ্যাত দারবিশ নাচ। একজন আরব ঘোষক মান্দারিন ভাষায় অনুষ্ঠানের সূচনা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরব পোশাক পরা একজন চীনা, তিনি কথা বলছিলেন আরবি ভাষায়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন হু চুনহুয়া। তিনি চীনের পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের একজন ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁর পাশে বসেছিলেন সৌদি আরবের বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ আল–ফালিহ।

যে অনুষ্ঠানকে ঘিরে এই আয়োজন, তা হলো ১০ম আরব–চীন বাণিজ্য সম্মেলন। দুই দিনের এই আয়োজনে ২৩টি দেশ থেকে অংশ নেন ৩ হাজার ৫০০ জন প্রতিনিধি, যাঁদের মধ্যে ১ হাজার ২০০ জন উদ্যোক্তা ও কোম্পানির নির্বাহী এসেছিলেন চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে।

হংকংয়ের কমার্স অ্যান্ড ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট সেক্রেটারি অ্যালগারনন ইয়াউ ইং–ওয়া শহরটি থেকে আসা ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব দেন। সম্মেলনে বক্তব্য দেন হংকং স্টক একচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী নিকোলাস আগুজিন এবং হ্যাং লাং প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান রনি চ্যান চি–চুং।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সৌদি আরবে এক সফর শেষে রিয়াদ ত্যাগ করার পাঁচ দিন পর চীন–সৌদি আরব সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়, যাকে দেখা হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার একটি পরিষ্কার চিহ্ন হিসেবে।

সৌদি আরবের নয়জন মন্ত্রী, তিনজন উপমন্ত্রী এবং প্রায় ডজনখানেক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন ‘চীনের কাছ থেকে শেখা’ কেন প্রয়োজন। এখানে চীন বলতে হংকংকেও বোঝানো হয়েছে। আর এই শিক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং চলাচলের ভবিষ্যৎ।

সম্মেলন চলার সময়ে দুই ডজন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সব মিলিয়ে যার আর্থিক মূল্যমান এক হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে একটি প্রকল্পেই খরচ হবে ৫৬০ কোটি ডলার। এই প্রকল্পের আওতায় সৌদি আরবে বিদ্যুৎ–চালিত গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেল সংযোজন করে তা রপ্তানি করা হবে।

সৌদি আরবে অবশ্য কেউ বিদ্যুৎ–চালিত গাড়ি চালান না বললেই চলে। কারণ, দেশটিতে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম মাত্র ২ দশমিক ৩৩ রিয়াল, মার্কিন মুদ্রায় যা মাত্র ৬২ সেন্ট। হংকংয়ের পাম্পে এর চার গুণ দামে পেট্রল বিক্রি হয়।

তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব একটি গাড়ি আমদানিকারক দেশ থেকে পরবর্তী প্রজন্মের গাড়ি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে চায়। এমন গাড়ি তারা রপ্তানি করতে চায়, যা আবার তেলে চলে না, চলে বিকল্প জ্বালানিতে।

এই পরিকল্পনা সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০–এর একটি অংশ। দেশটি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। এই সঙ্গে চায় অর্থনীতিকেও বৈচিত্র্যময় করতে। সে কারণে জোর দিতে চায় প্রযুক্তি থেকে সেবা—এসব খাতে।

আর এখানেই চীনের মূল ভূখণ্ড এবং হংকংয়ের বড় সুযোগ। চীনের কিছু কোম্পানি এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কর্মকাণ্ড বাড়িয়েছে। বাওস্টিল ৪৩ কোটি ৭৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করবে সৌদি আরামকো এবং সৌদি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলকে সঙ্গে নিয়ে। এর আওতায় রাস আল–খায়ের শিল্পনগরে কম কার্বন নিঃসরণ করে, এমন ইস্পাত তৈরি করা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রল–নির্ভর বাজারে ব্যাটারিচালিত গাড়ি বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে এক্সপেন নামের একটি চীনা কোম্পানি, যেটি চীনের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুৎ–চালিত গাড়ির নির্মাতা। বেইজিংভিত্তিক কোম্পানি নিও জুন মাসেই আবুধাবির রাষ্ট্রমালিকানাধীন সিওয়াইভিএন ফান্ডের কাছে শেয়ার বিক্রি করে ৭৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলার তুলেছে।

চীন ও সৌদ আরবের মধ্যে সম্পর্কের এই সুর বেঁধে দেওয়া হয় যখন ডিসেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফর করেন। আর ওই সফরের পরপরই সৌদি আরব চীনের কাছে ইউয়ানে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে রাজী হয়। চীন হলো সৌদি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

অন্যদিকে সৌদি আরব চীনের এই অনুগ্রহ ফেরত দিচ্ছে চীনা বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই ন্যাসডাক এবং হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আলিবাবা গ্রুপ, পিনডুডু ও সেন্সটাইম।

গত মার্চে চীন সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয়ে মধ্যস্থতা করে। এর আওতায় দুই দেশ তাদের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে।

তবে বাণিজ্য ও কূটনীতির বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওই কথাটি, যা সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী আল–ফালিহ তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু রনি চ্যান এবং হংকংয়ের প্রতিনিধিদলকে ১১ জুনের উৎসবের পর এক একান্ত আলোচনায় বলেছিলেন। তাঁর মূল কথা ছিল, ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানো দরকার’।

আল–ফালিহ বলেন, ‘অন্য একটি দেশ সম্পর্কে একজন সাধারণ মানুষের ধারণা অর্থের প্রবাহ বা বাণিজ্যের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে তিনি সেখানে কী ভোগ করেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের বোঝাপড়া বাড়লে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবাহ এমনিতেই বাড়বে।’