বিশ্ববাজারে সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়

সোনাফাইল ছবি রয়টার্স

বিশ্ববাজারে এক বছর ধরে সোনার দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝুঁকছেন। বলা যায়, সোনার প্রতি আকর্ষণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬০০ ডলারে পৌঁছায়। এরপর অবশ্য সোনার দামের ঊর্ধ্বগতি থেমেছে। এখন তা ৫ হাজার ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস, সোনার দাম আউন্সপ্রতি সাত হাজার ডলারে উঠতে পারে।

দেখা যাক, সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়, বিভিন্ন বাজারে সোনার দাম কত আর কোন দেশগুলোর হাতে সোনার মজুত সবচেয়ে বেশি। খবর আল–জাজিরা

সোনার মূল্য নির্ধারণ

সোনা বা সোনাভিত্তিক পণ্যের মূল্য বুঝতে হলে দুটি বিষয় জানা জরুরি। একটি হলো ওজন (ট্রয় আউন্সে), আরেকটি বিশুদ্ধতা (ক্যারেটে)।

ওজন (ট্রয় আউন্সে)

বিশ্ববাজারে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতুর ওজন সাধারণত ট্রয় আউন্সে পরিমাপ করা হয়। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। ধরা যাক, প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার। সেই হিসাবে ১ গ্রাম সোনার দাম প্রায় ১৬০ ডলার। এই হিসাবে এক কেজি ওজনের সোনার বারের দাম পড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

ট্রয় আউন্সের হিসাব আর সাধারণ আউন্সের হিসাব এক নয়। সাধারণ আউন্সের ওজন ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম। খাদ্যসহ দৈনন্দিন পণ্যের ওজন মাপতে এই হিসাব ব্যবহৃত হয়।

বিশুদ্ধতা (ক্যারেট)

দেশের বাজারে যখন সোনার দাম বাড়ে বা কমে, তখন সেই সংবাদে অবধারিতভাবে যে বিষয়টি থাকে, তা হলো কোন ক্যারেটের সোনার দাম কত। অর্থাৎ ২২ ক্যারেট ২১ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেটের সোনার দাম পৃথকভাবে উল্লেখ করা থাকে।

এই ক্যারেট হলো সোনার বিশুদ্ধতার মানদণ্ড। খাঁটি সোনা ২৪ ক্যারেট। ২২, ২১, ১৮ ক্যারেট বা সনাতনী পদ্ধতির সোনার সঙ্গে রুপা, তামা বা দস্তার মতো কম দামি ধাতুর মিশ্রণ থাকে।

সোনার বিশুদ্ধতা বোঝাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার গয়নায় নির্দিষ্ট চিহ্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন ২৪কে বা ৯৯৯ মানে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ। ১৮কে গয়নায় সাধারণত ৭৫০ লেখা থাকে, অর্থাৎ এটি ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ। দেখে নেওয়া যাক, কোন ধরনের সোনার কী বৈশিষ্ট্য—

২৪ ক্যারেট: ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ। গাঢ় কমলা আভা, নরম, মরিচা ধরে না। সাধারণত বিনিয়োগের কয়েন বা বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২২ ক্যারেট: ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ বিশুদ্ধ। গাঢ় কমলা রং, মাঝারি মানের টেকসই, মরিচা প্রতিরোধী, বিলাসবহুল গয়নায় ব্যবহৃত হয়।

১৮ ক্যারেট: ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ। হলুদ রং, বেশি টেকসই, সময়ের সঙ্গে কিছুটা মলিন হতে পারে, উন্নতমানের গয়নায় ব্যবহৃত হয়।

৯ ক্যারেট: ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিশুদ্ধ। ফিকে হলুদ রং, সবচেয়ে টেকসই, সময়ের সঙ্গে মলিন হয়, কম দামি গয়নায় ব্যবহৃত হয়।

এ ছাড়া ১৪ ক্যারেট (৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ বিশুদ্ধ) ও ১০ ক্যারেট (৪১ দশমিক ৭ শতাংশ বিশুদ্ধ) সোনাও বিভিন্ন দেশে প্রচলিত। গয়নার দাম সাধারণত নির্ভর করে সেদিনের সোনার স্পট মূল্য, তৈরির খরচ ও করের ওপর।

গ্রাহক যদি পণ্যের সঠিক ওজন ও ক্যারেট সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তাহলে মূল দামের সঙ্গে কারিগরি খরচ যোগ করে হিসাব মিলিয়ে নিতে পারেন। সাধারণত স্পট মার্কেটে সোনার দাম নিয়ে দর–কষাকষি করা যায় না, তবে তৈরির খরচ নিয়ে অনেক সময় দরদাম সম্ভব।

১০ বছরে সোনার দাম চার গুণ

সোনার কদর আজকের নয়, হাজার হাজার বছর ধরে এটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মুদ্রা, গয়না ও সম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা বাজারের অস্থিরতা—এমন সময় মানুষ সাধারণ ‘নিরাপদ আশ্রয়’ সোনার দিকে ধাবিত হন।

একসময় সোনার মান সাপেক্ষে বাজারে মুদ্রা ছাড়া হতো। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মার্কিন ডলার সোনার মানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ক্লাসিক্যাল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ১৮৩৪ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী ধরে ২০ ডলারের বিনিময়ে ব্যাংক থেকে এক আউন্স সোনা পাওয়া যেত। মহামন্দার সময় ১৯৩৩ সালে অর্থনীতি চাঙা করতে সোনার দাম বাড়িয়ে প্রতি আউন্স ৩৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে সোনা থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর বাজারশক্তির ভিত্তিতে সোনার দাম নির্ধারণ শুরু হয়। গত এক দশকে সোনার দাম চার গুণ বেড়েছে—২০১৬ সালে যেখানে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ১ হাজার ২৫০ ডলার, বর্তমানে তা ৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।

দেশে দেশে সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়

আন্তর্জাতিক বাজারে লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো এক্সচেঞ্জে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার স্পট মূল্য নির্ধারিত হয় মার্কিন ডলারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বাজারে এই দাম দেশীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয় ও চাহিদা অনুযায়ী প্রিমিয়াম।

কোন দেশের বাজারে সোনার দাম কত পড়বে, তার সঙ্গে সেই দেশের শুল্কনীতির যোগ আছে। যেমন ভারতের বাজারে সোনা ৩ শতাংশ জিএসটি আরোপ করা হয়, যদিও যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনতে কর দিতে হয় না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সাপেক্ষে স্বর্ণমুদ্রা ও বার তৈরি হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ইগল, চীনের গোল্ড পান্ডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার করুগারর‌্যান্ড উল্লেখযোগ্য।

কোন দেশের কাছে বেশি সোনার মজুত

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বৃদ্ধি করেছে। সোনার দাম যে এতটা বেড়েছে, তার পেছনে এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোরও ভূমিকা আছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সোনা মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, ৮ হাজার ১৩৩ টন। দ্বিতীয় স্থানে জার্মানি, তাদের কাছে আছে ৩ হাজার ৩৫০ টন। তৃতীয় স্থানে ইতালি—তাদের হাতে আছে ২ হাজার ৪৫১ টন।