ভেনেজুয়েলার তেল পেলেও কতটা সফল হবেন ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ৫ কোটি ব্যারেল তেল তুলে দেবে।
বিশ্লেষকেরা বলছে, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প চাঙা করতে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার মূল উদ্দেশ্য যে তেল, ট্রাম্পের কথায় তা আবারও পরিষ্কার হলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল তুলে দেবে।
এই তেল দিয়ে কী হবে, তার পরিকল্পনাও জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এই তেল বাজারমূল্যে বিক্রি হবে। শুধু তা–ই নয়, এই তেল বিক্রির অর্থ তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কল্যাণে তা ব্যয় হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। খবর বিবিসির
আগামী ১৮ মাসের মধ্যে মার্কিন তেলশিল্প ভেনেজুয়েলায় পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করবে বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই তিনি এই পাঁচ কোটি ব্যারেল তেলের কথা বললেন। তাঁর আশা, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করবে। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প চাঙা করতে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেই বিনিয়োগের ফসল ঘরে তুলতে এক দশকের মতো সময় লেগে যাবে।
গতকাল মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল উচ্চমানের ও নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল হস্তান্তর করতে যাচ্ছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এই তেল বাজারদরেই বিক্রি করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতেই থাকবে। লক্ষ্য হলো এই অর্থ যেন ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করা।’
ভেনেজুয়েলার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার এক দিন পর ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। নিকোলা মাদুরোকে এখন মাদক পাচার ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
গত সোমবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা যদি আবার তেল উৎপাদনে ফেরত যায়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো। কেননা, এতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।’
সিবিএস জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় পেট্রোলিয়াম কোম্পানির প্রতিনিধিরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসার পরিকল্পনা করছেন।
তবে এর আগে বিশ্লেষকেরা বিবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে এবং দামে বড় প্রভাব পড়বে না। তাঁদের মতে, বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলো সরকারব্যবস্থায় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা চাইবে। বিনিয়োগ হলেও সেসব প্রকল্প থেকে ফল পেতে অনেক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো মেরামতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাস্তবতা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত—আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল—থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ তেলবাজার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল আনুমানিক ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। এই পরিসংখ্যান ১০ বছর আগের উৎপাদনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি। বাস্তবতা হলো, ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বিশ্বব্যাপী মোট তেল ব্যবহারের ১ শতাংশের কম।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এই বিপুল মজুত যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে; যদিও মার্কিন কোম্পানিগুলোর পক্ষে ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন বাড়ানো ব্যয়সাপেক্ষ হবে।
বড় কোম্পানিগুলো সতর্ক
কার্যত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহার নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও তেল কোম্পানিগুলো সতর্ক। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি এক্সনমবিলের মন্তব্য চেয়েছিল দ্য গার্ডিয়ান। কিন্তু তারা সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
আরেক বড় তেল কোম্পানি কনোকোফিলিপস জানিয়েছে, তারা ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা বিনিয়োগ নিয়ে এখনই জল্পনা করা উচিত হবে না। তারা মনে করছে, সেই সময় এখনো আসেনি।
মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আগপর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ক্রিয়াশীল একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি ছিল শেভরন। ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ লাইসেন্স পায় শেভরন। তার ভিত্তিতে কোম্পানিটি সেখানে কাজ করছে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মোট তেল উত্তোলনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উত্তোলন করছে শেভরন। সেই তারা জানিয়েছে, আপাতত কর্মীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘প্রযোজ্য সব আইন ও বিধিমালা মেনেই’ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
এ পর্যন্ত অন্য বড় তেল কোম্পানিগুলো ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেনি; এ বিষয়ে কেবল শেভরনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
দ্যা গার্ডিয়ান জানিয়েছে, তেল খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছেন। তারা আরও বলেছে, ‘তেল কোম্পানিগুলো কোনো দেশে বিনিয়োগ করবে কি না, তা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল—রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মাটির নিচে থাকা সম্পদের পরিমাণ।’
রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও এখানে মুনাফার বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বিষয়টি হলো, ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগ করে অমিত পরিমাণ মুনাফার সম্ভাবনা আছে—এই হাতছানি উপেক্ষা করা কঠিন।
ডেটা প্ল্যাটফর্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ পণ্যবিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলভান্ডার কাজে লাগাতে আগ্রহী তেল কোম্পানিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।
ভেনেজুয়েলার তেল কেন প্রয়োজন
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—এ ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে তেল উৎপাদন করে, তা মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ তেল পরিশোধনাগারের যে সক্ষমতা, তাতে তাদের ভারী ও অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন।
অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্র তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে এই থিকথিকে ও ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হবে।
এ-ই হচ্ছে বাস্তবতা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।
কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করলেও ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়।
এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়।