চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের গাড়ি নির্মাতারা

চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়িফাইল ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের গাড়ি ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত বাজার হারাচ্ছে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে। শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নয়, ব্যাটারি, সফটওয়্যার, নকশা ও উৎপাদন প্রযুক্তিতেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি প্রদর্শনী ‘অটো চায়না ২০২৬’ উপলক্ষে বেইজিং ও হেফেইয়ের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে বিবিসি দেখেছে, চীনের গাড়ি শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়নের গতি বিদেশি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে।

জাপানি গণমাধ্যমকে হোন্ডার প্রধান নির্বাহী তোশিহিরো মিবে বলেন, সাংহাইয়ের অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় কারখানা দেখে তাঁর মনে হয়েছে, ‘এদের সঙ্গে আমাদের কোনো সুযোগই নেই।’

ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লেও সতর্ক করে বলেছেন, চীনা কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক সম্প্রসারণের কারণে পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতারা এখন ‘টিকে থাকার লড়াইয়ে’ নেমেছে।

দশকের পর দশক ধরে বিদেশি কোম্পানিগুলো চীনা অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গাড়ি তৈরি করলেও এখন সেই সম্পর্কের ধরন বদলে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে তারা।

সাংহাইভিত্তিক গাড়ি বিশ্লেষক বিল রুসো বলেন, উন্নত বিশ্ব সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করছে, তা হলো—তারা ভাবছে এই পরিবর্তন কেবল বৈদ্যুতিক গাড়িকে ঘিরে। অথচ আসল লড়াই হচ্ছে ভবিষ্যতের ‘মোবিলিটি প্রযুক্তি’ কে নেতৃত্ব দেবে, তা নিয়ে।

‘চাকার ওপর স্মার্টফোন’
চীনের আধিপত্য শুধু গাড়ি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি এখন ৩১৫টির বেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬৩। এর অনেকগুলোই বৈদ্যুতিক গাড়ির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত—যেমন ব্যাটারি, যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন সরঞ্জাম।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাবে, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় চীনে ছোট আকারের বৈদ্যুতিক এসইউভি উৎপাদনে অন্তত ৩০ শতাংশ কম খরচ হয়। এর বড় কারণ কম ব্যাটারি খরচ ও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা।

এই সুবিধা তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর সরকারি সহায়তার মাধ্যমে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের হিসাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীন বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, এসব ভর্তুকি বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করছে। তবে এই সহায়তাই চীনা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে ও দাম কমাতে সহায়তা করেছে।

চীনের ভেতরের তীব্র প্রতিযোগিতাও উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়েছে। শাওমি, হুয়াওয়ে ও আলিবাবার মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখন গাড়ি তৈরি করছে। ফলে ভোক্তা প্রযুক্তি ও গাড়িশিল্পের মধ্যে দূরত্ব কমে এসেছে।

বিল রুসোর ভাষায়, ‘তারা এখন আর পশ্চিমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে না, নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা করছে।’

গাড়ি এখন ক্রমেই সফটওয়্যারনির্ভর হয়ে উঠছে—ড্রাইভার সহায়ক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বিনোদনব্যবস্থা পর্যন্ত। এই পরিবর্তন চীনা কোম্পানিগুলোকে আরও এগিয়ে দিচ্ছে।

বেইজিংয়ের বাইরে শাওমির ইভি কারখানায় প্রায় প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি গাড়ি উৎপাদন লাইন থেকে বের হচ্ছে।

মাত্র ২০২৪ সালে প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনার পরই শাওমি চীনের শীর্ষ বিক্রিত ব্র্যান্ডগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য হলো গাড়ি, স্মার্টফোন, অ্যাপ ও স্মার্ট হোম ডিভাইসকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা।

হেফেইতে নিওর কারখানার বড় অংশ প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়।

অন্যদিকে বিওয়াইডি এমন দ্রুতগতির চার্জিং প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে মাত্র ৫ মিনিটে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার চলার মতো চার্জ দেওয়া যায়, যা কি না গাড়ির পুরো ট্যাংকে পেট্রোল ভরার সময়ের কাছাকাছি।

এক্সপেংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হে শিয়াওপেং বিবিসিকে বলেন, কোম্পানিটি বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি মানবসদৃশ রোবট ও উড়ন্ত গাড়ি নিয়েও কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আগামী এক দশকে প্রতিটি গাড়ি কোম্পানিকেই রোবোটিকস কোম্পানিতে পরিণত হতে হবে।’

ভাবছে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো
বিদেশি গাড়ি নির্মাতারা এখন বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের জন্যও চীনের ওপর নির্ভরশীল। টেসলা সাংহাইয়ে তৈরি মডেল-৩ ইউরোপে রপ্তানি করছে। একইভাবে বিএমডব্লিউর চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক মিনি গাড়িও বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। তবে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থা দুর্বল হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবিলিটির তথ্য অনুযায়ী, চীনের গাড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অংশীদারত্ব ২০২০ সালের ৬৪ শতাংশ থেকে চলতি বছর নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে। এর প্রভাব পড়েছে জেনারেল মোটরস (জিএম) ও জার্মান গাড়ি নির্মাতাদের আয়ে, যারা দীর্ঘদিন চীনের বাজার থেকে বড় মুনাফা করত।

বিলাসবহুল গাড়ির বাজারেও চাপ বাড়ছে। হুয়াওয়ের মেক্সট্রো এস ৮০০ সেডান এখন চীনে এক লাখ ডলারের বেশি দামের গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। এটি পোরশে পানামেরা ও বিএমডব্লিউ ৭ সিরিজের সম্মিলিত বিক্রিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ড সরবরাহ করত, আর চীনা অংশীদারেরা দিত কারখানা ও বাজার। এখন সেই সমীকরণ বদলে গেছে।

স্টেলান্টিস সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডংফেংয়ের সঙ্গে ১০০ কোটি ইউরোর একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় চীনে পিউজো ও জিপ ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হবে। এ ছাড়া স্টেলান্টিস ইউরোপে ডংফেংয়ের বৈদ্যুতিক ব্র্যান্ড ভয়াহ নিয়ে আসছে। এমনকি ফ্রান্সে চীনা নকশার গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।

ফক্সওয়াগেনও এক্সপেংয়ের সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় চালনা প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে নিজস্বভাবে এই প্রযুক্তি যথেষ্ট দ্রুত উন্নয়ন করতে পারেনি।

এক্সপেং প্রধান হে শিয়াওপেং বলেন, ‘আমরা একে অন্যের কাছ থেকে শিখি, তাই একে অন্যকে বিশ্বাস করি। সহযোগিতা করি।’

টয়োটা, হুন্দাই, ফোর্ড ও নিসানও চীনে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াচ্ছে অথবা বিদেশি কারখানায় চীনা নকশার গাড়ি তৈরির সম্ভাবনা খুঁজছে। তবে সব কৌশল সফল হচ্ছে না।

চীনের বাজারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা অডির ই৫ মডেলের বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের মূল্যছাড় দিতে হয়েছে।

জিএমও চীনে তাদের কার্যক্রমে কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদমূল্য কমিয়ে দেখিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের বিক্রি ২১ শতাংশের বেশি কমেছে।
জাপানি কোম্পানিগুলো তুলনামূলক ধীর গতিতে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকেছে। ফলে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে তারা চাপে পড়েছে, যেখানে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ফক্সওয়াগেন সাময়িকভাবে আবার চীনের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত গাড়ি ব্র্যান্ডের অবস্থানে ফিরেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ ছিল চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়।

বিশ্বজুড়ে বিস্তার
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এখন প্রবৃদ্ধি কমছে। অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও তীব্র মূল্য যুদ্ধের কারণে শিল্পটির মুনাফা চাপে পড়েছে।

এ কারণেই চীনা কোম্পানিগুলো বিদেশি বাজারে আরও আগ্রাসী হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরও বিওয়াইডি, চেরি ও এসএআইসির মতো প্রতিষ্ঠান ইউরোপ ও উদীয়মান বাজারে দ্রুত বিস্তার ঘটাচ্ছে।

চেরির জাইকু ৭ মডেল বাজারে আসার মাত্র ১৪ মাসের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত নতুন গাড়িগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তবে ১০০ শতাংশের বেশি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কার্যত চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গাড়ি উৎপাদন, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়ন যদি ক্রমেই চীনের দিকে সরে যায়, তাহলে ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে চাকরি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে।

পরামর্শক জেমস পিয়ারসনের ভাষায়, ‘একটি বাজার থেকে তাদের ঠেকিয়ে রাখলেও তারা অন্য বাজার খুঁজে নেবে।’

বিশ্লেষক বিল রুসো মনে করেন, গাড়িশিল্পের কেন্দ্র ইতিমধ্যেই চীনের দিকে সরে গেছে। তাঁর মতে, যারা সহযোগিতায় আগ্রহী, তাদের সামনে এখনো সুযোগ আছে। কিন্তু যারা শুধু চীনের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবে, তারা পিছিয়ে পড়বে।