তেলের বাজারে আবার ঢুকছে রাশিয়া, বিশ্ববাজারে কমেছে দাম
রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এবার নিজের বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে সেই রাশিয়ার কাছ থেকেই ডিজেল কিনছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাশিয়ার এই বাড়তি সরবরাহের ঘোষণা এসেছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় পরস্পরের হামলা বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব খবরে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে তেল ও ডিজেলের দাম।
আজ সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ১৮ ডলারে নেমে আসে। আগের কর্মদিবসের তুলনায় দাম কমেছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৩১ ডলারে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম নির্দেশক আইসিই গ্যাস-অয়েলের দাম কমেছে ৩ শতাংশ, ব্যারেলপ্রতি ১ হাজার ৪৩৬ ডলারে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প জানান, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং এর পরপরই অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও তিনি জানান।
জ্বালানির দাম কমাতে ট্রাম্পের উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে বাড়তি ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন সমঝোতার সম্ভাবনা
রাশিয়ার বাড়তি ডিজেল সরবরাহের পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সম্ভাবনার কারণেও তেলের দাম কমেছে। গতকাল রোববার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে রাজি হয়েছে।
সমঝোতা কার্যকর হলে তেল শোধনাগার ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে হামলার ঝুঁকি কমতে পারে। এতে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কাও কিছুটা কমবে। কিন্তু সমঝোতা কত দিন স্থায়ী হবে এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, এসব ঘোষণায় সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমেছে। তবে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে এবং কত দিন স্থায়ী হবে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এসব ঘোষণার প্রভাবে তেলের দামে বড় ধরনের পতনের সম্ভাবনা কম।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় ঝুঁকি
রাশিয়ার বাড়তি সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারের জন্য বড় ঝুঁকি। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা হয়েছে। এতে জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা সমুদ্রপথে হামলা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার বাড়তি সরবরাহের প্রভাব অতটা ইতিবাচক নাও হতে পারে।
কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কিন ডলারের চাহিদাও বাড়তে পারে।
চাঙা ডলার, নজর মূল্যস্ফীতিতে
এদিকে আজ এশিয়ার মুদ্রাবাজারে ডলার সূচক সামান্য কমে ১০২ দশমিক ১৪ পয়েন্টে নেমেছে। এর আগে গত সপ্তাহে সূচকটি ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। আজও তার কাছাকাছি আছে এর মান। বিশ্বের প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি পরিমাপ করে এই সূচক।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেপ্টেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামী বুধবার দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক প্রকাশ করা হবে। চলতি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সুদের হার নির্ধারণে মূল্যস্ফীতির এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের অর্থনীতি নিয়ে আস্থা আরও কমেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। এক মাস আগেও এই সম্ভাবনা ছিল ৫১ শতাংশ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল রোববার রয়টার্সকে বলেছেন, সদস্যদেশগুলোর উচিত, ডিজেলের অতিরিক্ত মজুত বাজারে ছাড়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা মূল্যায়ন করা। যেসব দেশ প্রতিশ্রুত জ্বালানি পুরোপুরি সরবরাহ করেনি, তাদের অবশিষ্ট সরবরাহ দ্রুত ছাড়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিরল।