কতগুলো দেশের জিডিপি ইলন মাস্কের সম্পদের চেয়ে কম
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে আলোচনায় এসেছেন। চলতি মাসের শুরুতে তাঁর কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) পর তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বাস্তবতা হলো, ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ এখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়েও বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ও ফোর্বস ম্যাগাজিনের তাৎক্ষণিক সম্পদ হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, কোন কোন দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) মাস্কের সম্পদের চেয়েও কম। বিশ্লেষণটি তৈরি করেছে ডেটাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।
আইএমএফের ২০২৬ সালের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৪টি দেশের জিডিপি এখনো ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের নিচে। এই তালিকায় সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে আছে তাইওয়ান। দেশটির সম্ভাব্য জিডিপি ৯৭৭ বিলিয়ন বা ৯৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এতে বোঝা যায়, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ক্লাবে প্রবেশ করার বিশেষত্ব কী।
১৭৪টি দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করা যাক। যেমন আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইডেন, ইসরায়েল, আর্জেন্টিনা, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নরওয়ে, থাইল্যান্ড, কলাম্বিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনস, হংকং ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে পারেনি।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড ও পোল্যান্ডের অর্থনীতির আকার প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ মাস্কের সম্পদ আরেকটু বাড়লে এই দেশগুলোর জিডিপিও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২১ দেশের জিডিপি ট্রিলিয়ন ডলার
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশের জিডিপি ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই তালিকায় সবার আগে আছে যুক্তরাষ্ট্র; ২০২৬ সালে তাদের জিডিপির আকার দাঁড়াবে সম্ভাব্য ৩২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন।
এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন; ২০২৬ সালে তাদের সম্ভাব্য জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২০ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। তৃতীয় থেকে ২১তম স্থান পর্যন্ত আছে যথাক্রমে জার্মানি, জাপান, জাপান, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব, সুইজারল্যান্ড ও পোল্যান্ড।
ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জিডিপি ও ব্যক্তিগত সম্পদ সরাসরি তুলনীয় নয়। জিডিপি হলো কোনো দেশে সারা বছরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট বাজারমূল্য। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পদ হলো দায়দেনা বাদ দিয়ে জমা হওয়া মোট সম্পদের পরিমাণ।
তবু এই তুলনা থেকে বড় একটি বাস্তবতা সামনে চলে আসে। সেটা হলো, মাস্কের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এক বছরে অনেক দেশের মোট উৎপাদনের মূল্যও ছাড়িয়ে যায়।
অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে
বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অন্য ধনীদের তুলনায় ইলন মাস্ক অনেকটা এগিয়ে গেছেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময় মাস্কের পরে যে চারজন শীর্ষ ধনী আছেন, অর্থাৎ ল্যারি পেজ, সার্জেই ব্রিন, জেফ বেজোস ও মাইকেল ডেল—তাঁদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৯৯৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এখন মাস্কের একার সম্পদ ৯৪৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
ইলন মাস্কের ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তাঁর রকেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের আইপিও। তবে আইপিওর পর কোম্পানিটির শেয়ারের দামে বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ফলে মাস্কের সম্পদের পরিমাণও স্থির নয়।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি মাস্কের সম্পদ ৯৫০ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। তুলনার সুবিধার্থে এখানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে মাস্কের এই সম্পদ মূলত কাগুজে সম্পদ; এটা ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা নগদ অর্থ নয়। তাঁর সম্পদের মূল্য নির্ভর করছে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে টেসলা ও স্পেসএক্সকে কতটা মূল্যায়ন করেন, তার ওপর।
এই অর্থ দিয়ে কী করা যায়
মানুষের জীবদ্দশায় যুক্তিসংগত উপায়ে ট্রিলিয়ন বা লাখোকোটি ডলার ব্যয় করা প্রায় অসম্ভব। কেউ যদি প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার করে খরচ করেন, তাহলেও লাখোকোটি ডলার ব্যয় করতে তাঁর এক শতাব্দীর বেশি সময় লেগে যাবে।
সিএনএনের সংবাদে বলা হয়েছে, ওয়াল স্ট্রিটসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় আর্থিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল ম্যানহাটানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২০২৪ সালে ছিল এক ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি। অথচ মাস্কের একার সম্পদই এক ট্রিলিয়নের বেশি।
খেলার ক্লাব বা স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি ধনকুবেরদের প্রিয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর একটি। এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব বড় খেলার ক্লাব কেনা সম্ভব।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দামি ৫০টি ক্লাবের সম্মিলিত মূল্য মাত্র ৩৫৩ বিলিয়ন বা ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এ তালিকার সবচেয়ে মূল্যবান দল এনএফএলের ডালাস কাউবয়েজ, এই ক্লাবের মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। তালিকার ৫০তম দল এনবিএর টরন্টো র্যাপটরসের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলার।