ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ঋণ পরিশোধ করছে আদানি গোষ্ঠী

আদানি সাম্রাজ্যের কর্নধার গৌতম আদানি
ছবি: এএফপি

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পেতে মরিয়া ভারতের আদানি গোষ্ঠী। হিনডেনবার্গ ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া সাজানো বাগানের শ্রী ফেরাতে এর বিকল্পও নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইকোনমিক টাইমসের এক সংবাদে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পেতে বিভিন্ন কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করতে শুরু করেছে আদানি গোষ্ঠীর বিভিন্ন কোম্পানি। আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেড গতকাল সোমবার এসবিআই মিউচুয়াল ফান্ডের কাছে বকেয়া ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। মার্চে আরও এক হাজার কোটি রুপির ঋণ পরিশোধ করবে তারা।

আদানি পোর্টসের মুখপাত্র ইকোনমিক টাইমসকে বলেন, কোম্পানির বিদ্যমান নগদ স্থিতি ও ব্যবসা পরিচালনা থেকে গঠিত তহবিলের অর্থ দিয়ে এই ঋণ আগেভাগে পরিশোধ করা হচ্ছে।

এদিকে ৮ ফেব্রুয়ারি আদানি এসইজেড বলে, আগামী অর্থবছরে তারা পাঁচ হাজার কোটি রুপি ঋণ পরিশোধ করবে। এ ছাড়া আগামী মাসে তাদের যে ৫০ কোটি ডলার ব্রিজ লোন পরিশোধ করার কথা, তা–ও করবে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সব মিলিয়ে আদানি গোষ্ঠীর ঋণের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ২৬ লাখ কোটি রুপি এবং সেদিন তাদের হাতে নগদ স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৬৪৬ কোটি রুপি। তবে সামগ্রিকভাবে আদানি গোষ্ঠী এখন নিজেদের দায়িত্বশীল প্রমাণের চেষ্টা করছে। ১১ ফেব্রুয়ারি ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুব সম্প্রতি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া কয়লাখনি কেনার চুক্তি শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছে আদানি গোষ্ঠী। বাজারে এখন তাদের অনেক ঋণ। বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাসও হোঁচট খেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ব্যয় না বাড়িয়ে আদানি গোষ্ঠী ভালোই করেছে বলে মনে করছেন বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আরও একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি গোষ্ঠী নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেছে। আর সে লক্ষ্যে এক আন্তর্জাতিক নামী জনসংযোগ সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেক্সট সিএনসি নামে ওই সংস্থা এর আগেও অনেক কোম্পানিকে খাদ থেকে টেনে তুলেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে তারা বেশ নামও করেছে। তারা এখন আদানিদের ‘ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের’ দায়িত্ব নিয়েছে। কেক্সট নাকি বেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজও শুরু করে দিয়েছে। তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কেক্সট বা আদানিদের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

এর পাশাপাশি হিনডেনবার্গের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে সেরা আইনি সংস্থাকেও নিয়োগ দিয়েছে তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনি সংস্থা ওয়াচটেল, লিপটন, রসেন অ্যান্ড ক্যাটজকে আদানিদের ওকালতি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আর্থিক বিশেষজ্ঞেরা আদানিদের এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, এর দুটি ভালো দিক আছে। এক. আদানিরা বুঝিয়ে দিল, বিশ্বের সেরা আইনি সংস্থাকে নিয়োগ করার মতো আর্থিক ক্ষমতা এখনো তাদের আছে। দুই. সেরা আইনি সংস্থা হিনডেনবার্গের দাবি ভুল প্রমাণ করে মামলা জিতবে—এমন সম্ভাবনাও আছে। এতে হিনডেনবার্গ মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

হিনডেনবার্গের অভিযোগ, আদানি গোষ্ঠী শেয়ার দর কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করে নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে। অনেক দিন ধরেই তারা এই অপকর্ম করে আসছে। কিন্তু আদানিরা প্রথম থেকেই এই অভিযোগ নাকচ করে আসছে। আদানিরা সেই অভিযোগের কাছে নতিস্বীকার না করে আইনি পথে বিরোধিতার হুমকি দেয়।

বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পাল্টা জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত আদানিকে আরও বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। যদিও আদানিরা শুধু সেখানে থেমে থাকেনি, একের পর এক ব্যবস্থা নিয়েছে তারা। চলছে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রাণান্তকর চেষ্টা।

এদিকে হিনডেনবার্গ প্রতিবেদন শুধু আদানির ক্ষতি করেছে, তা নয়; বরং ভারতীয় পুঁজিবাদকেও ইতিহাসের কঠিনতম পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’–এর সম্পাদক শেখর গুপ্ত। সম্প্রতি ‘দ্য প্রিন্ট’–এর অনলাইনে প্রচারিত এক ভিডিওতে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের আগে ভারতে সেই অর্থে পুঁজিবাদ ছিল না। ভারতে এর আগেও বড় সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সংসদে অনেক আলাপ-আলোচনা ও উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু এবারের সংকট তার চেয়ে ভিন্ন। কারণ, ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পুরো বিষয়টি ঘটছে বাজারের নিজস্ব নিয়মে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতে আসছেন। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আসছে—এ নিয়ে রাজনীতিকেরা অনেক গর্ব করেন। কিন্তু এফডিআই আসার সঙ্গে আরও অনেক কিছু আসে, সেটাও ভাবতে হবে।

শেখর গুপ্তের মত, এখন পর্যন্ত ভারতীয় পুঁজিবাদ এই পরীক্ষায় উতরে গেছে; কারণ, সরকার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। বাজারের নিজস্ব নিয়মে সব ঠিকঠাক করতে আদানিদের আরও চেষ্টা করতে হবে।