যুক্তরাষ্ট্রে বিনা শুল্কে গরুর মাংস আমদানি, বার্গারের দাম কমবে কি

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের একটি মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় কাজ করছেন এক কর্মীফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বার্গারের দাম কমাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তাঁর পরিকল্পনার ফলে ভোক্তাদের ব্যয়ে তেমন একটা প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প এক নির্বাহী ঘোষণায় সই করেছেন। এতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৯০ দিনের জন্য ৩ লাখ মেট্রিক টন গরুর মাংস শুল্ক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, আমদানি করা এই মাংস ‘বাজারদরের চেয়ে ২৫ শতাংশ কম দামে’ বিক্রি করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি পাউন্ড গরুর কিমার গড় দাম এখন প্রায় ৬ দশমিক ৮৯ ডলার।

তবে গরুর কিমায় শুল্ক কম থাকার কারণে কীভাবে এর দাম কমবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস বিস্তারিত কিছু জানায়নি। শুধু সিএনএনকে বলা হয়েছে, শুল্ক না থাকায় বিদেশি রপ্তানিকারকেরা কম দামে গরুর মাংস দিতে আগ্রহী। এ ছাড়া এই কর্মসূচিতে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো আমদানি করা মাংস সত্যিই নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

তবে মাংস কম দামে বিক্রি হলেও মুদিদোকানে এর প্রভাব খুব বেশি পড়বে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি অর্থনীতিবিদ গ্লিন টনসর মাংসের দাম নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় বাজারে কিছু অতিরিক্ত মাংস আসবে, বিষয়টি ভোক্তাদের জন্য ভালো হতে পারে। তবে এতে কতটা সুফল মিলবে, তা বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ আছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ৩ লাখ মেট্রিক টন গরুর মাংস দেশটির মোট অভ্যন্তরীণ ভোগের মাত্র ২ শতাংশের সমান। এর ওপর শুল্ক ছাড়ের সুবিধা শুধু গরুর মাংসের কিছু অংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এসব অংশ অন্য ধরনের মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে কিমা তৈরি করা হয়। ফলে শুধু ওই অংশের ওপর শুল্ক তুলে নিলে ভোক্তাদের জন্য গরুর মাংসের সামগ্রিক দাম কমে যাবে, সেই সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন টনসর।

দাম কমবে কি না, তা নির্ভর করবে আরেকটি বিষয়ের ওপর। সেটা হলো, আমদানি করা মাংসের কারণে বাজারে সরবরাহ বাড়বে, নাকি তা দেশীয় সরবরাহের বিকল্প হবে, তার ওপর।

গরুর মাংসের দাম কেন বেড়েছে

তিন বছর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে গরুর কিমাসহ সব ধরনের গরুর মাংস ও বাছুরের মাংসের দাম এখন ২৭ শতাংশ বেশি। শুধু গত এক বছরেই এসব মাংসের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। জুলাইয়ের ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) তথ্য থেকে এ হিসাব পাওয়া গেছে।

সিএনএনকে দেওয়া বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই বলেন, ‘ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায়’ যুক্তরাষ্ট্রে মাংসের দাম বেড়েছে।

কুশ দেশাই বলেন, স্বল্প মেয়াদে গরুর মাংসের চাহিদা মেটাতে প্রেসিডেন্টের নেওয়া পদক্ষেপ সহায়ক। একই সঙ্গে প্রশাসন মার্কিন খামারিদের সঙ্গে কাজ করছে। লক্ষ্য, দেশেই গরুর মাংসের উৎপাদন ও গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ানো। এর পেছনের কারণ হলো, কয়েক দশকের মধ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গরুর সংখ্যা সবচেয়ে কম।

টনসর বলেন, সরবরাহের ঘাটতির বিষয়টি সত্য। তবে শুধু গরুর মাংসের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে এটাকে দেখলে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশেষ করে মার্কিন খামারিরা এখন আগের তুলনায় বড় আকারের গরু পালন করছেন, যেখান থেকে বেশি পরিমাণ মাংস পাওয়া যায়।

সরবরাহের দিক থেকে আরও কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম মেক্সিকোতে নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম নামের একধরনের পরজীবী পোকার প্রাদুর্ভাব। এর কারণে সম্প্রতি পর্যন্ত মেক্সিকো থেকে জীবিত গরু আমদানি বন্ধ ছিল।

তবে টনসরের মতে, গরুর মাংসের দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহের চেয়ে চাহিদার ভূমিকা বেশি।

টনসর পরিচালিত মাসিক ‘মিট ডিমান্ড মনিটর’ জরিপে গত মাসে প্রায় ৩ হাজার মার্কিন নাগরিক অংশ নেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাউন্ড গরুর কিমার জন্য তাঁরা গড়ে ১০ দশমিক শূন্য ৯ ডলার এবং রেস্তোরাঁয় বার্গারের জন্য ২৪ দশমিক ৬২ ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি।

তিন বছর আগে একই জরিপে প্রতি পাউন্ড গরুর কিমার জন্য ভোক্তারা গড়ে ৮ দশমিক ৬৭ ডলার এবং বার্গারের জন্য ২০ দশমিক ১৯ ডলার দিতে রাজি ছিলেন।

টনসর বলেন, গরুর মাংসের প্রতি মার্কিন ভোক্তাদের এই বাড়তি আগ্রহের পেছনে মাংসের মান উন্নত হওয়ার প্রভাব আছে। জরিপে পাওয়া ভোক্তাদের মতামতের ভিত্তিতে তিনি এ কথা বলেন।

এই পরিস্থিতিতে গরুর মাংসের দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বাজারে অতিরিক্ত গরুর মাংস সরবরাহ করা গেলেও দাম কমতে পারে। এই বাড়তি সরবরাহ মার্কিন ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।