রায়হান আলীর কারখানায় চার ধরনের পোশাক তৈরি হয়। এগুলো হলো আরব দুনিয়ার বাদশাহ ও আমির-ওমরাহদের জন্য স্বর্ণখচিত জরির বিস্ত, অভিজাত ও মধ্যবিত্তের জন্য বিস্ত এবং বোরকার আদলে নারীদের জন্য আভায়া। এসব পোশাক তৈরিতে আরব দেশের আবহাওয়ার উপযোগী যে বিশেষ ধরনের কাপড় ব্যবহৃত হয়, তা উৎপাদিত হয় জাপানে। প্রয়োজন হয় স্বর্ণখচিত জরি। তা উৎপাদন করে সৌদি আরব। ভারতীয় জরিও ব্যবহৃত হয় তুলনামূলক কম দামের পোশাকে।

মমতাজ বিস্ত মহল কারখানায় বর্তমানে ৩৫ জন কর্মী কাজ করেন। তাঁরা সাত দিনে গড়ে একটি করে পোশাক তৈরি করতে পারেন। রায়হান আলীর হাতে গড়া এই কারখানা বর্তমানে মাসে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বিস্ত ও আভায়া উড়োজাহাজে করে সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকার সমান।

বগুড়ার সদর উপজেলার বানদীঘি হাপুনিয়াপাড়ার পাশের কবুরহাটে গত বৃহস্পতিবার রায়হান আলীর কারখানায় গিয়ে তাঁর কাছে ভিন্নধর্মী পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির আদ্যপ্রান্ত শুনলাম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিদের হাতে তৈরি নান্দনিক এই পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’

শুরুর গল্প

default-image

রায়হান আলীর শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না। দুই যুগ আগে ১৯৯৯ সালে ভাগ্যান্বেষণে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। আলী মোহাম্মদ আল গাত্তান নামের একটি কারখানায় আমির ওমরাহদের পোশাক তৈরির কাজ শেখেন কয়েক মাস। তারপর ৮০০ সৌদি রিয়েল মাসিক বেতনে সেই কারখানায় কাজ নেন। সেখানে হাতের নিপুণ কারুকাজে বিস্ত ও আভায়া তৈরি করে কারখানামালিকের নজরে পড়েন। বেতন বেড়ে হয় সাড়ে তিন হাজার রিয়েল। ভালো আয় হলেও বিদেশে ভালো লাগত না রায়হানের। মন পড়ে থাকত দেশে। ২০০৪ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে বগুড়ার নিউমার্কেটে তৈরি পোশাকের দোকান দেন। তবে ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে দুই বছরের মধ্যেই আবার সৌদি আরবে ফিরে যান।

২০০৬ সালে সৌদি আরবে ফিরে ২০ জন বাংলাদেশি ও ভারতীয় কারিগর নিয়ে বিস্ত ও আভায়া তৈরির কারখানা দেন রায়হান আলী। সৌদি সরকার বাংলাদেশিদের ব্যবসার লাইসেন্স না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে হানি মোহাম্মদ আল মার্শাল নামের এক ব্যক্তির নামে কারখানা চালান। বিনিময়ে সেই ব্যক্তিকে মাসে দেড় হাজার রিয়াল দিতে হতো। ওই কারখানায় তৈরি পোশাক দাম্মাম, রিয়াদ, জেদ্দাসহ নানান শহরে বিক্রি হতো। পাশাপাশি কাতারের বিস্ত আল সালেম ও বিস্ত আল সালেম নামের দুই প্রতিষ্ঠানও রায়হানের কারখানার পোশাক কিনত।

রায়হান আলী বললেন, ‘কারখানার মালিক ও কারিগর সবাই বাংলাদেশি। তবে পোশাকে লিখতে হতো মেড ইন সৌদি অ্যারাবিয়া। খুব কষ্ট লাগত। তাই ২০১১ সালে বড় ভাই তোতা মিয়াকে কারখানা বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসি। দুই বছর তেমন কিছুই করিনি।’

সৌদি আরবে রায়হান প্রথম যে কারখানায় কাজ করতেন, সেখান থেকে পোশাক কিনত কাতারের আল শরাফি ট্রেডিং ইস্ট নামের একটি কোম্পানি। আবু রায়হানের হাতে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের নজর কেড়েছিল। রায়হান প্রথমবার দেশে ফেরার আগেই যৌথভাবে ব্যবসা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁরা। তখন সাড়া দেননি। হঠাৎ করেই সেই কোম্পানি আবার যৌথ ব্যবসার প্রস্তাব পাঠায়। এবার রাজি হলেন রায়হান। ২০১৩ সালে কাতারে চলে যান। কারখানা করেন।

রায়হান আলী বলেন, ‘কাতারজুড়ে ২৬টি বিক্রয়কেন্দ্রে আমাদের কারখানার পোশাক বিক্রি হতো। মুনাফার ২০ শতাংশ পেতাম। এবারও পোশাকে লেখা হচ্ছিল মেড ইন কাতার। রাগে-ক্ষোভে ৯ মাসের মাথায় অনেকটা শূন্য হাতেই দেশে ফিরে আসি।’

দেশে ফিরে জমি বিক্রি ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নিজ গ্রামেই কারখানা দেন। তারপরের গল্প শুরুতেই বলা হয়েছে। গ্রামের অশিক্ষিত, বেকার, কলেজের শিক্ষার্থী, নারীসহ অর্ধশতাধিক তরুণ-তরুণীকে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন তিনি।

কারখানার শুরুর দিকে ভালোই চলছিল। মাসে ২০০ থেকে ২৫০টি তৈরি পোশাকের চালান সৌদি আরবে পাঠান। মাসে প্রায় ৮০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হচ্ছিল। কাতার ও দুবাই থেকেও ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করে। হঠাৎ করেই স্থানীয় কয়েকজন পাশেই একটি কারখানা করেন। বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে রায়হানের ৪০ জন কারিগরকে নিয়ে যান। শ্রমিকসংকটে কারখানা বন্ধ হয় রায়হানের। ছয় মাস পর আবার সৌদি আরবে পাড়ি দেন। সেখানে মাস তিনেক থেকে ২০১৭ সালে দেশে ফিরে ২৫ জন পুরোনো কারিগর নিয়ে কারখানা চালু করলেন। অন্যদিকে ব্যবসা ধরতে না পেরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

রায়হানের কারখানায় ৩৫ জন কারিগর কাজ করছেন। প্রতিটি ধাপের জন্য মজুরি পান ৮০০ টাকা। পোশাকের নকশা ও কাটিংয়ের কাজটি রায়হান নিজেই করেন।

কারিগর মিনহাজ প্রামাণিক বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাস। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে সম্মান শ্রেণিতে পড়ার সময় টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি কারখানায় কাজ করে প্রতি মাসে গড়ে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন।

ভিন্নধর্মী পোশাকের চ্যালেঞ্জ

সৌদি এই রাজকীয় পোশাকের কাঁচামালের পুরোটায় আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে জাপানি থ্রেট কটন কাপড়, স্বর্ণখচিত জরি; দুবাই থেকে দুবাই আল মানি জরি ও ভারত থেকে জরি আমদানি করছেন।

রায়হান আলী বলেন, সৌদি আরব থেকে জাপানি থ্রেট কাপড় আমদানি করতে প্রতি গজে খরচ ২০০ টাকা। এ ছাড়া আল মানি গোল্ড ৫ দশমিক ৫ জরি প্রতি কেজি আমদানিতে লাগে প্রায় দুই লাখ টাকা। এক কেজি দুবাই আল মানি জরি ৮৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং ভারতীয় জরি আমদানিতে ২০ হাজার টাকা গুনতে হয়।

বগুড়ার এই উদ্যোক্তা বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে দাম্মাম শহরের দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটার। তবে সড়কপথে পৌঁছা যায় মাত্র তিন ঘণ্টায়। আর বগুড়া থেকে রাজধানীর বিমানবন্দরের দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার। আমদানি পণ্য নিয়ে সড়কপথে বগুড়ায় রওনা দিলে কারখানায় পৌঁছাতে সময় লাগে ৮ ঘণ্টা। কাঁচামাল আমদানিতে পরিবহন সমস্যা ছাড়াও আছে পুঁজি ও কারিগরের সংকট।

তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আছে সুখবর। রায়হান আলীর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর দুই ভাই নূর আলম ও তোতা মিয়া প্রবাস থেকে ফিরে বিস্ত ও আভায়া তৈরির কারখানা চালু করেছেন। নূর আলমের কারখানার নাম বিস্ত আল নূর।

বগুড়া জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির সহসভাপতি মাফুজুল ইসলাম বললেন, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি মেড ইন বাংলাদেশ লেখা এই পোশাক মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের সুনাম বাড়াচ্ছে।

বিশ্ববাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন