যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে কানাডার নতুন শুল্ক আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বাণিজ্য যেমন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, তেমনি বাণিজ্য যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে।
নতুন শুল্কের আওতায় আছে পোশাক, পনির, ধাতব যন্ত্রাংশ ও কাঠজাত পণ্য। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর কানাডা এ পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে কানাডার কিছু পণ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
তবে আপাতত এর অর্থনৈতিক প্রভাব অতটা বেশি না-ও হতে পারে। কেননা, নতুন শুল্ক যেসব পণ্যে আরোপিত হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার বার্ষিক মোট বাণিজ্যের ছোট একটি অংশ। তবে বড় আশঙ্কা হলো, পাল্টাপাল্টি শুল্কের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে দুই দেশের পরিবার ও ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত। কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো শুল্ক আরোপ করলে কানাডাও সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা কানাডার অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উপহাস করেছেন। ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়িতে আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। গত শুক্রবার তিনি বলেছেন, দুই দেশের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমন সম্ভাবনাও আছে।
কানাডার বিমান কোম্পানি বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রে বোম্বার্ডিয়ারের আর বিমান বিক্রি হতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ভোক্তাদের কানাডার কিছু পণ্য না কেনার আহ্বান জানান।
বোম্বার্ডিয়ার বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানশিল্প দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসে ডানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা আছে তাদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের বাণিজ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্র্যাড উড বলেন, পাল্টাপাল্টি শুল্ক কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্যই ক্ষতিকর। নতুন শুল্ক দুই দেশের বাণিজ্যে আরও বড় বাধা তৈরি করছে।
কানাডার সঙ্গে বিরোধের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন আরও কয়েকটি দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তারা অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন করছে, প্রশাসন যাকে ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ বলছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ওই সব দেশের দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য–ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন শুল্ক এ সপ্তাহেই কার্যকর হতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের কিছু শুল্ক বাতিল করার পর সেগুলোর বিকল্প হিসেবেও নতুন শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছে প্রশাসন।
যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য রপ্তানি করে, কিন্তু তার চেয়ে কম পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে, তাদের সঙ্গেও বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশসহ অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য–ঘাটতি আছে।
শুল্কের কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ে। ফলে ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলছে। এ সপ্তাহেই দেশটির নতুন ভোক্তা মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য বিরোধ প্রকাশ্যে তীব্র হয় জুলাই মাসে। ট্রাম্প তখন কানাডার বিরুদ্ধে মার্কিন শিল্পের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন। সেই সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে সমঝোতা না হলে কানাডার কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি।
কয়েক মাস ধরে আলোচনা চললেও আগস্টে তা ভেস্তে যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ওয়াইন, পনির, পোশাক, হকি স্টিকসহ শত শত কানাডীয় পণ্যে শুল্ক আরোপ করে। জবাবে কানাডা একই ধরনের মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়।
এরপরও দুই দেশের বিরোধ কমেনি। ট্রাম্প কানাডার রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করেছেন। অন্টারিও হ্রদের নাম বদলে লেক আমেরিকা করার নির্বাহী আদেশও দিয়েছেন।
রোববার কানাডার মুদ্রা বিনিময় হার নিয়েও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের সঙ্গে কানাডীয় ডলারের এ ‘ভারসাম্যহীনতা’ আর মেনে নেওয়া হবে না।