বিদেশে বসবাস বা বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে সহজে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়—এমন দেশের খোঁজ সব দেশের মানুষই কমবেশি করেন। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মার্কিন নাগরিক দ্বিতীয় পাসপোর্ট নিতে চান বা ইতিমধ্যে নিয়েছেন। আবার প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে যাওয়ার কথা ভেবেছেন বা পরিকল্পনা করছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৪৪ লাখ মার্কিন নাগরিক বিদেশে বসবাস করছেন, ২০১০ সালের তুলনায় যা ৪২ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকের কাছে দ্বিতীয় নাগরিকত্বের প্রধান আকর্ষণ বিদেশে চলে যাওয়া নয়; বরং অনিশ্চিত সময়ে বিকল্প সুযোগ তৈরি করে রাখা।
সম্প্রতি বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্দিষ্ট বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্বের এই ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত পাসপোর্টও পাওয়া যায়। তবে গত এক দশকে এই খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। কেলেংকারি ও কূটনৈতিক চাপের কারণে অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
এই পটভূমিতে ইন্টারন্যাশনাল লিভিং সাময়িকী ২০২৬ সালে দ্রুত ও তুলনামূলক সহজে নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে—এমন কয়েকটি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে। বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলো বরাবরই এগিয়ে। মার্কিন ও ইউরোপীয় নাগরিকদের কাছে এসব দ্বীপের আকর্ষণও আছে। এ ছাড়া ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশও আছে এই তালিকায়। সূত্র: ফোর্বস ম্যাগাজিন।
কম্বোডিয়ায় অনুদান বা অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলার বা তার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ আছে। বিনিয়োগকারীরা আবাসন, ব্যবসায়িক প্রকল্প বা সরকারি তহবিলে বিনিয়োগ করতে পারেন। এখানে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই। কম্বোডিয়ার এই কর্মসূচি নতুন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে এটি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। ক্যারিবীয় বা ইউরোপীয় দেশের তুলনায় কম খরচে নাগরিকত্বের সুযোগ দিচ্ছে দেশটি।
জর্ডানের কর্মসূচি মূলত অতি উচ্চ সম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এখানে নাগরিকত্ব পেতে প্রায় ১৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। সাধারণত বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প, আবাসন বা ব্যাংকে আমানত রাখা যেতে পারে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকেরা জর্ডানে বসবাসের পাশাপাশি ওই অঞ্চলে ব্যবসার সুযোগ পান। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ব্যয়বহুল।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের বাইরে তুলনামূলক কম খরচে নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ দেয় মিসর। এখানে ন্যূনতম ১ লাখ ডলার অনুদান বা ৫ লাখ ডলার ব্যাংকে জমা রেখে (তিন বছর মেয়াদে) নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়। বিনিয়োগভিত্তিক নাগরিকত্বের বাজারে এটি তুলনামূলক নতুন কর্মসূচি। এই কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে নতুন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো গুণাবলি আছে এই কর্মসূচির। নাগরিকত্ব পাওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা মিসরে বসবাসের পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। এই কর্মসূচি বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্কে নাগরিকত্বের জন্য চার লাখ ডলারের আবাসন কেনা বা পাঁচ লাখ ডলার ব্যাংকে জমা রাখা কিংবা বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। সাধারণত এই বিনিয়োগ তিন বছর রাখতে হয়। তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। তাই তুরস্কের নাগরিকত্ব পেলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না।
নর্থ মেসিডোনিয়ায় অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। বিনিয়োগের প্রারম্ভিক পরিমাণ ২ লাখ ইউরো। তার চেয়ে বেশি পরিমাণও বিনিয়োগ করা যায়। সেই বিনিয়োগ অন্তত তিন বছর ধরে রাখতে হয়। দেশটি ইউরোপে হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়।
সেন্ট লুসিয়ায় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে ৩ লাখ ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে দেশটিতে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই।
গ্রেনাডার নাগরিকত্ব কর্মসূচির বিশেষ সুবিধা আছে। এই দেশের নাগরিকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ই-২ ইনভেস্টর ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন। বেশির ভাগ ক্যারিবীয় দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। এখানে নাগরিকত্ব পেতে ন্যূনতম ২ লাখ ৩৫ হাজার ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে বিনিয়োগ করতে হয়।
ডোমিনিকার কর্মসূচি তুলনামূলক সাশ্রয়ী। ন্যূনতম ২ লাখ ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এখানে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সম্প্রতি ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের মতো ডোমিনিকার ভিসামুক্ত ভ্রমণসুবিধা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে কিছু প্রশ্ন উঠেছে।
অ্যান্টিগা ও বারবুডার কর্মসূচি তুলনামূলক নমনীয়। এখানে ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে তিন লাখ ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা কঠিন শর্ত আছে। শর্তগুলোর একটি হলো—প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচ দিন দেশটিতে অবস্থান করতে হবে।
১৯৮৪ সালে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব কর্মসূচি চালু করে। এটি আধুনিক সিবিআই (বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব) মডেলের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে আবেদনকারীরা ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার সরকারি তহবিলে অনুদান দিয়ে বা অনুমোদিত আবাসন খাতে ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। আবাসনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত সাত বছর মালিকানা ধরে রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে দেশটিতে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই।