সংকটের মধ্যে বিশ্ববাজারে বাড়ছে ডলারের দাম, ফিরে পাচ্ছে পুরোনো গৌরব

ডলারপ্রতীকী ছবি

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের উত্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সংকটকালে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলার এখনো কার্যকর।

সংবাদে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গ্রিনব্যাক আবারও ঐতিহ্যগত ‘ক্রাইসিস কারেন্সি’ বা সংকটকালীন মুদ্রার পরিচয় ফিরে পেয়েছে। খবর রয়টার্সের

কয়েক মাস ধরেই ডলার নিয়ে বাজারে সংশয় ছিল। বিশেষ করে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বিক্রির ধুম পড়লেও ডলার প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছিল, চাপের সময়ে ডলারের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ কি ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

তবে এবার যেন সেই সন্দেহ কিছুটা কেটে গেছে। সোমবার প্রধান প্রায় সব মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়েছে। ডলার সূচকের মান (বিশ্বের প্রধান ছয়টি মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের অবস্থান) প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে সাত মাসের মধ্যে ডলার সূচকের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হয়েছে।

কানাডার বহুজাতিক স্কশিয়াব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ এরিক থিওরেট বলেন, ‘আজকের দিনটি ডলারের দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে ধ্রুপদি দিন। কেননা এদিন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ না করে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ডলারের আশ্রয় নিয়েছেন।’

এরিকের ভাষায়, ‘লিবারেশন ডে’ আমাদের চিরপরিচিত ঐতিহাসিক ধারা থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। বিষয়টি হলো, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন, সেই দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেশন ডে’ বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আখ্যা দেন। ওই ঘোষণার পর ডলারসহ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা যায়। অর্থাৎ তখন ডলার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারেনি।

ডলারের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি স্বস্তিকর। কেননা গত কয়েক মাসে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান কিছুটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল। ইউরো, ইয়েন ও সোনার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল ডলার। সাধারণত সোনার দাম বাড়লে ডলারের দাম কমে। এত দিন তা–ই হয়েছে। কিন্তু এবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলা শুরু হওয়ার পর দুটোর দামই একসঙ্গে বাড়ছে।

গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্যানুসারে, সোমবার বিশ্ববাজারের সোনার দাম বেড়েছে আউন্সপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি। ফলে সোনার দাম এখন ৫ হাজার ৩৬৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শিগগরিই তা আবার সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৮৯ ডলারে উঠেছিল।

আরও পড়ুন

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারের গভীরতা ও শক্ত ভিত ডলারের জন্য সহায়ক। এরিক থিওরেটের ভাষায়, ‘আপনি যদি বড় পরিসরে ঝুঁকি কমাতে চান, মার্কিন ট্রেজারি বাজারই একমাত্র বাজার, যে বাজার আপনার ঝুঁকির মাত্রা সামলাতে পারে।’ সংকটের সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের চাহিদা বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের মার্সার অ্যাডভাইজার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডন ক্যালকাগনি বলেন, ‘ডলারের বিকল্প নেই, এটাও বড় কারণ। অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার থেকে দূরে থাকা কঠিন। তাই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের নৈপুণ্যে আমি তেমন একটা অবাক নই।’

ঝুঁকির উৎস যখন যুক্তরাষ্ট্র

গত বছর বাজারের অস্থিরতায় ডলার কেন নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হতে পারেনি, এর ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তখন ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। ওয়াশিংটনের শুল্ক–ঝড় বিশ্ববাজারে তোলপাড় সৃষ্টি করে। যে দেশ অনিশ্চয়তার উৎস, তার মুদ্রায় আশ্রয় নিতে বিনিয়োগকারীদের অনীহা থাকা স্বাভাবিক।

ম্যাক্রো গবেষণা ও কৌশল প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো হাইভের গবেষক বেঞ্জামিন ফোর্ড বলেন, ট্রাম্পের তথাকথিত ‘স্বাধীনতা দিবসের’ ঘোষণায় ডলারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বের অন্য অঞ্চলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এখন তেলের দামও বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগের অবস্থান থেকে মুখ ফিরিয়ে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।

বিএনওয়াইয়ের আমেরিকাস ম্যাক্রো কৌশলবিদ জন ভেলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে ধাক্কা এলে ডলারের আবেদন ক্ষুণ্ন হতে পারে। কিন্তু যখন সংকট আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক, তখন ডলারের আবেদন অটুট থাকে। এখনকার বাজারে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিতর্ক শেষ নয়

তবে সবাই এতটা নিশ্চিত নন। রাবোব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশল প্রধান জেন ফোলি বলেন, এবারের সংকটের সময় ডলারের অবস্থান দেখে মনে হতে পারে, সে তার পুরোনো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি।

সোমবার ডলার শুধু নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র যে নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক, সে কারণেও পালে হাওয়া পেয়েছে। তেলের দাম বাড়লে সাধারণত আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক অ্যারন হার্ড মনে করেন, জ্বালানি বা তারল্যসংকটের বাইরে অন্য কোনো ধরনের ধাক্কায় ডলার একইভাবে শক্তিশালী না–ও থাকতে পারে। তাঁর কথায়, বিষয়টি যদি সাধারণ অর্থনৈতিক ভীতি হয়, তখন ডলার এতটা কার্যকর না–ও হতে পারে।

হার্ডের বক্তব্য হলো, আগে বড় সংকটের সময় শেয়ারবাজার পড়ে গেলেও ডলার সাধারণত শক্তিশালী হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন, ভবিষ্যতে বড় ধাক্কার সময় ডলার ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ একই সঙ্গে অস্থির হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ডলার সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা আগের মতো নেই।

ম্যাক্রো হাইভের ফোর্ড মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে ডলারের ভবিষ্যৎ তেলের দামের গতিপথের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়তে থাকবে আর বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমবে—এমন পরিবেশে ডলারের চাহিদা বাড়বে।

তবে তেলের দাম কমে গেলে প্রচলিত নিরাপদ মুদ্রা, যেমন সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েন আবার শক্তিশালী হতে পারে। তেমন পরিস্থিতিতে এই দুটি মুদ্রাই বিনিয়োগের জন্য লাভজনক মাধ্যম হবে বলে মনে করছেন ফোর্ড।