যুদ্ধের কারণে বিপাকে বিশ্বের এআই–শিল্প, হিলিয়ামের সংকট
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এই শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিষয়টি হলো, উপসাগরীয় এলাকায় একাধিক দেশের ডেটা অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম অনেকটাই বিনষ্ট করে দিয়েছে তেহরান। ডেটা সেন্টারের প্রাত্যহিক কাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
এক দিকে তেলের দাম বাড়তি, অপর দিকে তার জোগানও কম—এই দুই চাপে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হচ্ছে এআই–শিল্পকে। ডেটা সেন্টার চালানোর ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় কিছু সেন্টার হয় বন্ধ করে দিতে হয়েছে, না হয় এসব কেন্দ্রের কাজকর্মের রাশ টানতে হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর চিপের জন্য অতি প্রয়োজনীয় হিলিয়াম–অ্যালুমিনিয়াম, ব্রোমিনসহ একাধিক কাঁচামালের সরবরাহ সংকট। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বজুড়ে এর অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারী। কিন্তু গত এক মাসে হরমুজ প্রণালি একরকম বন্ধ থাকায় সরবরাহব্যবস্থা যেভাবে ধাক্কা খেয়েছে, তাতে আগামী বেশ কয়েক মাস এআই চিপ তৈরির পরিকল্পনা নতুন করে করতে হচ্ছে।
হিলিয়ামের ব্যবহার ও উৎপাদন
চিপ উৎপাদনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, যেমন শীতলীকরণ, ছিদ্র শনাক্তকরণ ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিখুঁত করতে হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরুর পর থেকে এই গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম উৎপাদিত হয়। এর উৎপাদন ভৌগোলিকভাবে খুবই সীমিত কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই কাতার থেকে আসে।
সরবরাহব্যবস্থা–বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিডাল ওয়েভ সলিউশনসের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ক্যামেরন জনসন রয়টার্সকে বলেন, ‘হিলিয়ামের ঘাটতি নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়।’ চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত শিল্প খাতের অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক আয়োজন ‘সেমিকন চায়না’ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
ক্যামেরন আরও বলেন, আপাতত উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া কোম্পানিগুলোর উপায় নেই। অনেকেই আশা করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।
জনসনের ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দেখা দিলে তাঁর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে অটোমোবাইল—বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর উপাদান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভিএটির চীন শাখার বিক্রয়প্রধান জেরি ঝ্যাং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হিলিয়ামের সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য কোম্পানির উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তিনি জানান, পরিবহন বিলম্বে পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।
জেরি আরও বলেন, বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও সরবরাহ আনার উদ্যোগ রয়েছে।
সংবাদে বলা হয়েছে, এই বিঘ্ন কেবল হিলিয়ামেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক বিস্তৃত সরবরাহের শৃঙ্খলে তা ছড়িয়ে পড়ছে। মাইক্রোনিকের এমআরএসআই ইউনিটের ঝৌ লিমিন জানান, ইসরায়েল থেকে সংগ্রহ করা কিছু কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিয়েছে। ফলে সরবরাহের সময় বাড়ছে। শেষমেশ তার প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর।
ঝৌ বলেন, স্বল্প মেয়াদে যে এআই খাতে প্রভাব পড়েছে, তা পরিষ্কার। এদিকে ফরাসি শিল্প গ্যাস কোম্পানি এয়ার লিকুইডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা গত বুধবার স্বল্প মেয়াদে হিলিয়ামের ঘাটতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
কোন খাতে হিলিয়ামের কত ব্যবহার
হিলিয়ামের খাতভিত্তিক ব্যবহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ—প্রায় ২২ শতাংশ ব্যয় হয় বিশ্লেষণাত্মক, প্রকৌশল, গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক কাজে। অর্থাৎ এটি কেবল সাধারণ গ্যাস নয়; বরং আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তির জ্বালানি।
এরপরেই রয়েছে ফাইবার অপটিকস ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, যেখানে ব্যবহৃত হয় ১৭ শতাংশ। আরও ১৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গ্যাস উত্তোলনের কাজে। স্বাস্থ্য খাতেও হিলিয়ামের গুরুত্ব কম নয়। এমআরআই স্ক্যান পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় মোট সরবরাহের ১৫ শতাংশ। এরপর মহাকাশ খাত। এই খাতে ব্যবহৃত হয় মোট হিলিয়ামের ৯ শতাংশ, বিশেষ করে রকেট প্রযুক্তিতে।
শিল্পকারখানায়ও এর ব্যবহার আছে, যদিও তুলনামূলকভাবে কম। ওয়েল্ডিংয়ে ব্যবহৃত হয় ৮ শতাংশ হিলিয়াম, ডাইভিং ও ছিদ্র শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয় ৫ শতাংশ করে। বাকি ২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় অন্যান্য খাতে।