বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীদের মধ্যে অনেকেই দানধ্যানের জন্য খ্যাত। আবার অনেক ধনীই আছেন, যাঁরা দানধ্যানে বিশ্বাসী নন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫ দাতার মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা নিজেদের সম্পদের অন্তত ৪০ শতাংশ দান করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তালিকায় এককভাবে নারী দাতা আছেন ৬ জন, ১১ জন আছেন স্বামী–স্ত্রী একত্রে, এমনকি সাবেক দম্পতিরাও আছেন।
অনেক গবেষকের মতে, দানধ্যানের ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলকভাবে উদার। কম বয়সেই তাঁদের মধ্যে দানধ্যানের প্রবণতা দেখা যায়। আবার দেখা গেছে, যাঁরা সোপার্জিত সম্পদের মালিক নন, তাঁদের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে দান করার প্রবণতা আছে। তবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও এই তালিকায় জায়গা হয়নি বিশ্বের দুই শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক ও ল্যারি পেজের। তাঁদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও দানের অঙ্ক সেই তুলনায় অনেক কম।
২০২৫ সাল পর্যন্ত দানের হিসাব এখানে করা হয়েছে। সম্পদের হিসাব সর্বশেষ। তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে দানের মোট অঙ্কের বিচারে; সম্পদের নিরিখে কত দান তাঁরা করেছেন, তার ভিত্তিতে নয়। দেখে নেওয়া যাক, যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের মধ্যে দানের তালিকায় শীর্ষ ১০–এ কারা আছেন:
জীবদ্দশায় দান: ৪৭০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: জলবায়ু পরিবর্তন, গৃহহীনতা
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ২%
মোট সম্পদ: ২৫ হাজার কোটি ডলার
এই দম্পতির প্রতিষ্ঠিত বেজোস আর্থ ফান্ড জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ইতিমধ্যেই ২৪০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। নানা উদ্ভাবনী প্রকল্প, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রবালপ্রাচীর পর্যবেক্ষণ ও মিথেন উৎপাদন কম হয়—এমন পশুপালনে এই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
নতুন এই দম্পতি বেজোস একাডেমির মাধ্যমে বিনা মূল্যের প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। সেই সঙ্গে তারা ডে ১ ফ্যামিলিস ফান্ডের মাধ্যমে গৃহহীনদের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করছেন।
জীবদ্দশায় দান: ৫১০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: পারকিনসনস রোগ, জলবায়ু পরিবর্তন
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ২%
মোট সম্পদ: ২৩ হাজার ৮২০ কোটি ডলার
সের্গেই ব্রিনের প্রয়াত মা পারকিনসনস রোগে ভুগেছেন বলে এই রোগের গবেষণায় মোট ২২০ কোটি ডলার দান করেছেন তিনি। এর মধ্যে ২০২৫ সালে দিয়েছেন ৪৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ ছাড়া তিনি গত বছর জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত অলাভজনক সংস্থাগুলোর জন্য ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন। ইদানীং তিনি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের রোগবিষয়ক গবেষণায় বিনিয়োগ করছেন, যেমন অটিজম।
জীবদ্দশায় দান: ৬১০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) জীববিজ্ঞান
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ৩%
মোট সম্পদ: ২১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার
এই দম্পতি এখন বিশ্বাস করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির কারণে রোগ নিরাময় বা প্রতিরোধ আগের চেয়ে অনেক দ্রুত করা সম্ভব। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁরা বায়োহাবে বিনিয়োগ করছেন। ২০২৫ সালে শুধু এই কোম্পানিকে তারা ৪০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। ফলে তাঁদের দাতব্য কর্মকাণ্ডের প্রধান লক্ষ্য এআইভিত্তিক জীববিজ্ঞান।
জীবদ্দশায় দান: ৬৫০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: অর্থনৈতিক গতিশীলতা
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ৪%
মোট সম্পদ: ১৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার
গত বছরের জানুয়ারিতে এই দম্পতির দাতব্য সংস্থা বালমার গ্রুপ ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও পরিবারকে সহায়তা দিতে একাধিক অনুদান কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ ছাড়া গত নভেম্বর মাসে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত কর্মসূচির জন্য আগামী এক দশকের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বালমার গ্রুপ। পাশাপাশি ইলিনয়, ক্যানসাস ও মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আচরণগত স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকগুলোর জন্য আরও ৭২ মিলিয়ন বা ৭ কোটি ২০ লাখ ডলার অনুদান ঘোষণা করে।
জীবদ্দশায় দান: ১ হাজার ৩০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: বিজ্ঞান, গণিত
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ২৪%
মোট সম্পদ: ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলার
কোয়ন্টিটেটিভ ট্রেডিং (ডেটাভিত্তিক বাণিজ্য) জগতের অগ্রদূত জিম সাইমনসের (মৃত্যু ২০২৪) স্ত্রী ম্যারিলিন সাইমনস গত এপ্রিলে নতুন গবেষণা তহবিল গঠনের জন্য ৮ কোটি ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। সাইমনস কোলাবোরেশন অন ইকোলজিক্যাল নিউরোসায়েন্স শীর্ষক এই উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবেশগত প্রভাব ও স্নায়ুবিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া।
জীবদ্দশায় দান: ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: গণতন্ত্র, মানবাধিকার
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ৭৬%
মোট সম্পদ: ৭৪০ কোটি ডলার
বর্তমানে জর্জ সোরোসের প্রতিষ্ঠিত ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁর ছেলে অ্যালেক্স সোরোস। ২০২৪ সালে এই ফাউন্ডেশন বিচার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য অনুদানের মধ্যে রয়েছে বারাক ওবামা ফাইন্ডেশনকে দেওয়া ৭০ লাখ ডলার, সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটিকে দেওয়া ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও সেনেগালভিত্তিক ওয়েস্ট আফ্রিকা ডেমোক্রেসি রেডিওকে দেওয়া ৩৫ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে এই ফাউন্ডেশনগুলো মোট কত অর্থ অনুদান দিয়েছে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
জীবদ্দশায় দান: ২৫.৪ বিলিয়ন ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ১৯%
মোট সম্পদ: ১০ হাজার ৯৪০ বিলিয়ন ডলার
জাতিসংঘের জলবায়ুদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা মাইকেল ব্লুমবার্গ গত বছরের নভেম্বরে মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমাতে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ–পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। আর্থিক তথ্য ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ এলপির প্রতিষ্ঠাতা ব্লুমবার্গ গত বছর ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ৫০ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে চার্টার স্কুল গড়ে তুলতে আরও এক কোটি ডলার বরাদ্দ করেন। এ ছাড়া তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে সিসা দূষণ কমানোর উদ্যোগ জড়িত হয়েছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইটাল স্ট্যাটেজিস ও পিওর আর্থের মতো সংগঠনকে ৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
জীবদ্দশায় দান: ২৬.৪ বিলিয়ন ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: শিক্ষা, অর্থনৈতিক সমতা
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ৪৬%
মোট সম্পদ: ২ হাজার ৮৫০ কোটি ডলার
২০২৫ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দান করেছেন ম্যাকেঞ্জি স্কট। একই সঙ্গে ২০১২ সাল থেকে ফোর্বস যখন শীর্ষ দাতাদের হিসাব রাখা শুরু করে, তারপর এক বছরে গত বছর ম্যাকেঞ্জির দানই সবচেয়ে বড়। সাত বছরের কম সময়ে তিনি ২ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানে মোট ২ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার দান করেছেন। মোট অঙ্কের দিক থেকে তাঁর চেয়ে বেশি দান করেছেন কেবল ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। তাঁর সাম্প্রতিক অনুদানে ১৮৬টি অলাভজনক সংস্থা সহায়তা পেয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের শেষ তিন মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তত ৭৬ কোটি ডলার অনুদান দেন। ২০১৯ সালে সাবেক স্বামী জেফ বেজোসের সঙ্গে বিচ্ছেদের সময় পাওয়া অ্যামাজনের শেয়ারের ৭৫ শতাংশের বেশি তিনি ইতিমধ্যে বিক্রি বা দান করে দিয়েছেন।
জীবদ্দশায় দান: ৫২.৬ বিলিয়ন ডলার
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য নিরসন
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ২৮%
মোট সম্পদ: ১৩ হাজার ৮১০ কোটি ডলার
দুজনের বিচ্ছেদ হয় ২০২১ সালে। পরে ২০২৪ সালে মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ছেড়ে নিজের দাতব্য কার্যক্রমে মনোযোগ দেন। তবু তাঁদের যৌথ দানের বড় অংশই বিবাহিত জীবনে এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে হওয়ায় ফোর্বস এখনো তাঁদের অনুদান একসঙ্গেই হিসাব করে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংগঠনগুলোকে সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০২৪ সালে বিল গেটস ওয়াশিংটনের রেডমন্ডভিত্তিক মেলিন্ডার সংগঠন পিভোটাল ফিলানথ্রোপিসে ১ হাজার ৮০ কোটি ডলার স্থানান্তর করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৪ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। মূলত নারী ও কন্যাশিশুর সামাজিক অগ্রগতির জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনকে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।
জীবদ্দশায় দান: ৬৮.৩ বিলিয়ন ডলার (গত বছরের তুলনায় ৬.৩ বিলিয়ন বেশি)
দান করার প্রধান ক্ষেত্র: স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য নিরসন
নিজ সম্পদের অনুপাতে দান: ৩২%
মোট সম্পদ: ১৪ হাজার ৭২০ কোটি ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উদার দাতা হিসেবে পরিচিত ওয়ারেন বাফেট ২০২৫ সালের শেষ দিকে ৯৫ বছর বয়সে নিজ কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে অবসর নেন। তবে তাঁর দান কার্যক্রম এখনো সমানভাবে চলছে। গত জুন মাসে তিনি নিয়মিত গ্রীষ্মকালীন অনুদানের অংশ হিসেবে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার দান করেন, যার পরিমাণ ছিল ৬০০ কোটি ডলার। একই বছরের নভেম্বরে তিনি পরিবারের দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য আরও ১০০ কোটি ডলার অনুদান দেন।