হরমুজ এখন অর্থনৈতিক হাতিয়ার, বিশ্ববাণিজ্যে কী প্রভাব
যে উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করেছিল, এখন যেন তা ভিন্ন খাতে চলে গেছে। যুদ্ধ এখন হরমুজ প্রণালির দখল নেওয়ার মধ্যে ঢুকে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের অন্যতম মূল বাণিজ্যপথ এই প্রণালি। সেই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার ও অন্যান্য পণ্য এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাতের পর যদি হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে উন্মুক্ত সমুদ্রে অবাধ নৌ চলাচলের নীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি হচ্ছে এই অবাধ নৌ চলাচল।
জ্বালানি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিক গ্রুন্ডটের ভাষায়, এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। বলা বাহুল্য, শেষমেশ সেই বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
হরমুজকে অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করছে ইরান
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বলা হচ্ছে, এর আগে যতবার তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে, গুরুত্বের দিক থেকে এটি অন্যতম বৃহৎ ঘটনা।
এর পর থেকেই হরমুজকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও।
বর্তমানে হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে হলে বিদেশি জাহাজগুলোকে ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষের (পিজিএসএ) সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সে জন্য মোটা অঙ্কের অর্থও গুনতে হচ্ছে। অন্যথায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হামলার ঝুঁকি থেকে যায়।
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর টোল আদায় সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমেনি।
বরং সমঝোতা স্মারকের একটি ধারাকে নিজেদের কর্তৃত্বের আইনি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে তেহরান। স্মারকের ওই ধারায় ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, এমনটাই তাদের দাবি।
ইরানের দাবি, সমঝোতা কার্যকরের পর তিন সপ্তাহে ২০০টির বেশি বিদেশি জাহাজ তাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ অতিক্রম করেছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, সমঝোতার মেয়াদে জাহাজগুলো কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে।
সমঝোতার পর কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। প্রতিদিন প্রায় ৭০টি জাহাজ চলাচল করছিল, যদিও তা যুদ্ধের আগের সময়ের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল আবার কমে এসেছে। গত রোববার এই জলপথ দিয়ে মাত্র এক ডজনের কিছু বেশি জাহাজ চলাচল করেছে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে বেড়েছে বিতর্ক
এই পরিস্থিতির মধ্যে একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল নেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়ার এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।
আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বিমকোর হিসাবে, ওই হারে মাশুল কার্যকর হলে অতি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজকে (ভিএলসিসি) প্রতি যাত্রায় প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতো।
বাস্তবে এ ধরনের মাশুল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন প্রস্তাব ইরানের অবস্থানের বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও। বিষয়টি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গও করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে লিখেছেন, ২০ শতাংশ অবশ্যই অনেক বেশি। ইরান ন্যায্য হারে মাশুল আদায় করবে।
সবচেয়ে বড় বাধা বিমা
হরমুজে নিয়মিত টোল আদায় শুরু হলে শুধু জাহাজ চলাচলের ব্যয়ই বাড়বে না, আরও বড় সমস্যা তৈরি হবে বিমা খাতে।
খবরে বলা হয়েছে, ইরান তেলবাহী জাহাজ থেকে প্রতি ব্যারেল তেলের বিপরীতে ১ থেকে ২ ডলার পর্যন্ত আদায় করছিল। এতে প্রতি ভিএলসিসি থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার রাজস্ব পাওয়া সম্ভব হতো।
জাহাজমালিকেরা সেই অর্থ দিতে রাজি ছিলেন। তবে সমস্যা হলো, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পরিশোধ করলে আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলো বিমাসুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিভেয়ার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী নাইজেল গ্রিন বলেন, বিমা কোম্পানিগুলো আইনি বিতর্কের আগেই সিদ্ধান্ত নেবে। টোল পরিশোধের সঙ্গে যদি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি জড়িয়ে যায়, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিমা বাতিল করতে পারে।
এমনকি ওমানের মতো কোনো তৃতীয় পক্ষ টোল সংগ্রহ করলেও তা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হবে না। সে ক্ষেত্রেও বিমা কোম্পানিগুলো জাহাজের বিমা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
উদ্বেগ শুধু হরমুজ নয়
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এই নজির অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহ দিতে পারে। ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, তাইওয়ান কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোও নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে টোল আরোপের কথা ভাবতে পারে।
রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ, মালাক্কা, জিব্রাল্টার, ডোভার, তাইওয়ান প্রণালিসহ বিশ্বের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে টোল চালু হলে বছরে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এমন ব্যবস্থা চালু হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বেশি ব্যয়বহুল ও খণ্ডিত হয়ে যাবে, বাণিজ্য সামরিক রূপ পাবে। সেই পরিবর্তনের প্রভাব জ্বালানি বাজারে পড়বে। পরিণামে বৈশ্বিক বাণিজ্যের খরচ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।