ভারতের চিপ উচ্চাশায় ধাক্কা, বেদান্তের প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াল ফক্সকন
ভারতের বেদান্ত লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা করতে চুক্তি করেছিল তাইওয়ানের ইলেকট্রনিকস সামগ্রী তৈরির কোম্পানি ফক্সকন। ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯৫০ কোটি ডলারের এই প্রকল্প দিয়ে ভারত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাণের জগতে পা ফেলতে যাচ্ছিল। এ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না।
কিন্তু ভারতের সেই চেষ্টা একটা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ফক্সকন গতকাল সোমবার জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের এই সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে তারা থাকছে না। ফক্সকন এই যৌথ উদ্যোগ থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করার কাজ শুরু করেছে। ফলে এখন এটা পুরোপুরি বেদান্ত বলে পরিচিত হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, বেদান্তের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই কারখানা নির্মাণে ফক্সকনের যে প্রণোদনা পাওয়ার কথা ছিল, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তা ছাড় করতে দেরি করায় ফক্সকন এই প্রকল্প থেকে সরে আসছে। তবে এটি একটি কারণ, তার সঙ্গে আরও কারণ আছে।
ফক্সকন ব্যয়ের যে হিসাব করে প্রণোদনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছিল, নয়াদিল্লি তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। সেই আপত্তি শেষমেশ নিষ্পত্তি না হওয়ায় ফক্সকন এই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে ভারতের চিপ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি উপমন্ত্রী রাজিব চন্দ্রশেখর রয়টার্সকে বলেন, ফক্সকনের এই সিদ্ধান্তে ভারতের চিপ নির্মাণের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে না। তিনি আরও বলেন, ফক্সকন ও বেদান্ত উভয়েই ভারতের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কোন কোম্পানি কার সঙ্গে জুটি বাঁধবে বা জুটি ভাঙবে, তার মধ্যে নাক গলানো সরকারের কাজ নয়।
ফক্সকন মূলত আইফোন ও অ্যাপলের অন্যান্য পণ্য তৈরির জন্য বিখ্যাত। তবে কয়েক বছর ধরে তারা চিপও তৈরি করছে।
চিপের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। গাড়ি থেকে শুরু করে মুঠোফোন—সব ধরনের ইলেকট্রনিকস যন্ত্রেই চিপ প্রয়োজন। ফলে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এ নিয়ে লড়াই চলছে, অর্থাৎ চিপ উৎপাদনের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে। এই জগতে ভারত নিতান্তই নতুন খেলোয়াড়।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ফক্সকনের সঙ্গে বেদান্তের চুক্তি হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তখন এই চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু মোদির সেই প্রকল্পের গতি খুব কম। রয়টার্সের আগের এক সংবাদে বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পে ইউরোপের চিপ কোম্পানি এসটিমাইক্রো ইলেকট্রনিকসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেই আলোচনা স্থবির হয়ে যাওয়াও ফক্সকনের এই প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ফক্সকন ও বেদান্ত এসটিমাইক্রোকে লাইসেন্সিং প্রযুক্তির জন্য যুক্ত করতে পারলেও ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা চায় এই কারখানায় এসটির অংশীদারিও থাকুক। তবে এসটি এ বিষয়ে আগ্রহী ছিল না, সে কারণে এই আলোচনার অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে এই ধাক্কার পরও ভারত সরকার মনে করছে, চিপ তৈরিতে তারা অন্যান্য বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করতে পারবে। গত মাসে মাইক্রন বলেছে, তারা ভারতে ৮২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে চিপ পরীক্ষা ও প্যাকেজিং ইউনিট স্থাপন করবে, তবে উৎপাদন করবে না। ভারতের কেন্দ্রীয় ও গুজরাট সরকারের সহায়তায় সেই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ হবে ২৭৫ কোটি ডলার।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ভারত সরকার ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। গত বছর তারা মোট তিনটি কারখানা স্থাপনের আবেদন পেয়েছে। ভারত সরকার আশা করছে, তাদের সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার ২০২৬ সালের মধ্যে ৬৩ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে।
ভারতে কারাখানা স্থাপনে আবেদন করেছিল ফক্সকন-বেদান্ত, সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইজিএসএস ভেঞ্চার ও আইএসএমসি নামের এক বৈশ্বিক কনসোর্টিয়াম। এর মধ্যে ৩০০ কোটি ডলারের আইএসএমসি প্রকল্প স্থগিত হয়ে গেছে, ইনটেলের সঙ্গে এক ঝামেলার কারণে তারা এই প্রকল্প স্থগিত করেছে। এ ছাড়া আইজিএসএসের ৩০০ কোটি ডলারের আরেকটি প্রকল্পও স্থগিত হয়ে যায়, কারণ তারা পুনরায় আবেদন জমা দিতে চায়।
এ বাস্তবতায় ভারত অন্যান্য কোম্পানির কাছ থেকে আবেদন চেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কোভিডের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলো চীননির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের জায়গা হচ্ছে ভারত।
তাই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নরেন্দ্র মোদি সরকার ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে। মোট ১৪টি শিল্পের জন্য আগামী পাঁচ বছর এই অর্থ ব্যয় করা হবে। ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এবং তাইওয়ানের ফক্সকন এই তহবিলের সুবিধা নিয়ে ভারতের মুঠোফোন উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে।
তবে শুধু বিদেশি কোম্পানি নয়, ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওলা এই সুবিধা নিচ্ছে। বেঙ্গালুরু শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে একটি বড় স্কুটার কারখানা স্থাপন করেছে তারা। তাদের লক্ষ্য শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া।