বার্কশায়ারের সঙ্গে বাফেটের ৬১ বছরের পথচলা শেষ, লোকসানি থেকে লাখ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠানের গল্প

ওয়ারেন বাফেটফাইল ছবি: রয়টার্স

বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বিনিযোগ গুরুখ্যাত ওয়ারেন বাফেট। দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্ব হস্তান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল এই কোম্পানিতে। অবশেষে নেতৃত্ব হস্তান্তরের শেষ ধাপে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর ছেলে হাওয়ার্ড বাফেট।

৯৬ বছর বয়সী বাফেট এখন চেয়ারম্যান ইমেরিটাস হিসেবে পরামর্শকের ভূমিকায় থাকবেন। পাশাপাশি তিনি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদেও থাকবেন। সেখানে তাঁর ‘বিচারবুদ্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি’ কোম্পানির পথ পরিক্রমায় কাজে লাগবে বলে শেয়ারধারীদের উদ্দেশে দেওয়া এক চিঠিতে জানিয়েছে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে। খবর বিবিসি।

এর ৯ মাস আগে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান ওয়ারেন বাফেট। গ্রেগ অ্যাবেলের কাছে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করেন বাফেট। তাঁর ছেলে ১৯৯৩ সাল থেকে কোম্পানিটির পরিচালক হিসেবে আছেন। অ্যাবেল যখন সিইওর দায়িত্ব নেন, তখন পরিচালনা পর্ষদের অনির্বাহী দায়িত্ব গ্রহণ করেন হওয়ার্ড।

ওয়ারেন বাফেট ‘ওমাহার জাদুকর’ নামেও পরিচিত। তিনি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সফল বিনিয়োগকারী। ১৯৬৫ সালে তিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন। তখন প্রতিষ্ঠানটি ছিল লোকসানে থাকা বস্ত্রকল। বাফেটের নেতৃত্বে সেটিই পরে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

বর্তমানে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের মালিকানায় আছে গাড়িবিমা প্রতিষ্ঠান জিকো, ডেইরি কুইন ও বিএএনএসএফ রেলওয়ে ব্যবস্থা। অ্যাপল ও কোকা-কোলার মতো কোম্পানিতেও বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে প্রতিষ্ঠানটির। কোকা-কোলা বাফেটের বিশেষ পছন্দের ব্র্যান্ড; তিনি প্রতিদিন পাঁচ ক্যান পর্যন্ত কোকা-কোলা পান করেন বলে জানা যায়।

আরও পড়ুন

বাফেটের বিনিয়োগের দর্শন ছিল অন্তর্নিহিত মূল্যভিত্তিক বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে বাফেট বিনিয়োগজগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর কৌশল ছিল শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি খুঁজে বের করে যুক্তিসংগত দামে সেগুলোর শেয়ার কেনা এবং দীর্ঘ সময় তা ধরে রাখা।

শেয়ারধারীদের উদ্দেশে তাঁর বার্ষিক চিঠি এবং উৎসবের আমেজে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভা-এসব করণেও তিনি আলোচিত হয়েছেন। এসব চিঠির কল্যাণে আর্থিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পরামর্শকে পরিণত হয়েছেন তিনি।

চেয়ারম্যানের পদ থেকে বাফেটের অবসর আকস্মিক পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত নেতৃত্ব হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা হিসেবেই বিষয়টি ঘটেছে।

চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দেওয়া উপলক্ষে লেখা চিঠিতে বাফেট বলেছেন, ‘দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়।’ সম্প্রতি নিজের ৯৬তম জন্মদিন এবং তাঁর এক প্রপৌত্রের প্রথম জন্মদিন উদ্‌যাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, শিশুটি তাঁর চেয়ে ‘একটু দ্রুত’ এগিয়ে যাচ্ছে।

কোম্পানিটি জানিয়েছে, দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসবে না। গ্রেগ অ্যাবেল কোম্পানির কৌশল ও মূলধনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিচালনা করবেন। চেয়ারম্যান হিসেবে হাওয়ার্ড বাফেটের প্রধান দায়িত্ব হবে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ‘সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ’ ধরে রাখা।

একসময় কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন হাওয়ার্ড। সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিত আছে তাঁর। একসময় শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিচালনা পর্ষদে তাঁর ছয় দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা আছে।

চিঠির শেষ দিকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জীবনের ‘সৌভাগ্যের বিষয়’ বলে উল্লেখ করেছেন বাফেট। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, শেষ পর্যন্ত ‘সময়কে কেউ হার মানাতে পারে না’।

বছরে ১ বার চিঠি লেখা অব্যাহত রাখবেন 

বাস্তবতা হলো, অবসর নেওয়ার পর বার্ষিক প্রতিবেদনের শুরুতে ওয়ারেন বাফেটের লেখা চিঠি আর থাকবে না। কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বছরে একবার চিঠি তিনি লিখবেন, অর্থাৎ এতকাল ধরে যা করে এসেছেন, তা একেবারে ছেড়ে দেবেন না। এর আগে তিনি জানিয়েছেন, দানধ্যানের গতি আরও বাড়াবেন। এখনো বার্কশায়ারের ১৪৯ বিলিয়ন বা ১৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের শেয়ার তাঁর হাতে। সেই শেয়ার দান করা অব্যাহত রাখবেন তিনি। কেননা, মূলত দানখয়রাতের জন্যই তিনি বিখ্যাত। শীর্ষ ধনীদের মধ্যে দানখয়রাতে তিনিই এগিয়ে। খবর সিএনএন।

ওয়ারেন বাফেট প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সংবাদপত্র পড়েন
ছবি: সিএমকিউ ইনভেস্টিং – সাবস্ট্যাক

বাফেটের বেড়ে ওঠা

ওয়ারেন বাফেট ১৯৩০ সালের ৩০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কার ওমাহায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাওয়ার্ড বাফেট ছিলেন শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। মাত্র ছয়-সাত বছর বয়সেই তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন, বড় হয়ে বিনিয়োগকারী হবেন।

শৈশবেই ব্যবসা ও অর্থ উপার্জনের নানা চেষ্টা শুরু করেন বাফেট। তাঁর দাদার ছিল মুদির দোকান। ছয় বছর বয়সে দাদার দোকান থেকে কোকা–কোলা কিনে লাভে বিক্রি করেন। পরে চুইংগাম, কোকা–কোলা ও পত্রিকা বিক্রি করেন। দাদার মুদির দোকানেও কাজ করেন।

মাত্র ১১ বছর বয়সে বাফেট জীবনের প্রথম শেয়ার কেনেন। নিজের সঞ্চয় দিয়ে সিটিজ সার্ভিসের ছয়টি শেয়ার কেনে। শেয়ারের দাম কমে গেলে তিনি অপেক্ষা করেন; পরে দাম বাড়লে বিক্রি করে দেন। এরপর শেয়ারের দাম আরও অনেক বেড়ে যায়। এ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পারেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব কতটা।

বাফেটের পরিবার ১৯৪৩ সালে ওমাহা থেকে ওয়াশিংটনে চলে যায়। তাঁর বাবা হাওয়ার্ড বাফেট তখন হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ওয়াশিংটনে যাওয়ার সময় বাফেটের হাতে ছিল প্রায় ১২০ ডলার; সেখানে থাকার সময় তাঁর সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ডলারে পৌঁছায়।

১৭ বছর বয়সে স্কুল শেষ করার পর বাফেটের কলেজে যাওয়ার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তিনি সরাসরি ব্যবসায় যেতে চেয়েছিলেন। তবে বাবার ইচ্ছায় ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ওয়ারটন স্কুলে ভর্তি হন। দুই বছর পর নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। পরে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে ভর্তির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন। সেই প্রত্যাখ্যানই শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, যেখানে তিনি কিংবদন্তি বিনিয়োগকারী বেঞ্জামিন গ্রাহামের ছাত্র হন।

বার্কশায়ারের সঙ্গে পথচলা

১৯৬২ সালে বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে নামের এক লোকসানি বস্ত্র কোম্পানির দিকে নজর যায় ওয়ারেন বাফেটের। কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল কম। বাফেট ধীরে ধীরে এর শেয়ার কিনতে শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেন। তখন বার্কশায়ার ছিল ক্ষয়িষ্ণু কোম্পানি। অর্থাৎ বার্কশায়ারের সঙ্গে তাঁর পথচলা ৬১ বছরের; এর মধ্যে ৫৬ বছর ছিলেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান।

প্রথম দিকে বাফেট কোম্পানিটির বস্ত্র কারখানা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই ব্যবসায় লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি বস্ত্র ব্যবসার পাশাপাশি বার্কশায়ারকে বিনিয়োগ ও ব্যবসা অধিগ্রহণের হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলেন। বিমা, রেলপথ, জ্বালানি, ভোক্তা পণ্যসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ শুরু করেন। এরপর ১৯৮৫ সালে বস্ত্র ব্যবসা একেবারেই বন্ধ করে দেন। শেষমেশ সেই কোম্পানি আজ পৃথিবীর অন্যতম সফল বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

এককথায়, বাফেটের শৈশবের তিনটি বিষয় তাঁর পরবর্তী জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছিল—অল্প বয়সে ব্যবসা করার আগ্রহ, ছোট ছোট উদ্যোগ থেকে অর্থ সঞ্চয় ও শেয়ারবাজার সম্পর্কে নিজে নিজে শেখার প্রবল আগ্রহ।