সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নিয়ারদের দুশ্চিন্তা কেন

যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাছবি: এএফপি

বাবার ব্যাংক হিসাবে বিলিয়ন ডলারের বেশি আছে। পরিবারের নামে অঢেল সম্পদ। জীবনে অর্থকষ্টের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও প্রায় নেই। তবু যুক্তরাষ্ট্রের অতিধনী পরিবারের বাবা-মায়ের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে একটি প্রশ্ন—তাঁদের সন্তানের আর্থিক ভবিষ্যৎ কী।

বিষয়টি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর বদলে যাওয়া চাকরির বাজারের কারণে সে আশঙ্কা বাস্তব হয়ে উঠছে। জেন–জি প্রজন্মের লাখো তরুণ এখন বেকারত্বের ঝুঁকিতে। প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে নিয়োগ কমেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এমন অনেক কাজ এআইয়ের দখলে চলে যাচ্ছে, যেসব কাজ একসময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বের হওয়া তরুণদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এ খবর দিয়েছে ফরচুন ম্যাগাজিন।

ফলে চাকরির বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত শুধু মধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের পরিবারে আটকে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি বাবা-মায়েদেরও এখন এখন একই উদ্বেগ—সন্তান কি চাকরি পাবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।

ইউএস ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যাসেন্ট প্রাইভেট ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকার বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টম থিগস। তাঁর ভাষ্য, শতকোটিপতিরা সন্তানকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেই পারেন, সেটা বিষয় নয়। সন্তানের সফলতার জন্য অর্থের বাইরে আর কী প্রয়োজন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সম্পদ ব্যবস্থাপক প্যাট্রিক ডোয়ারের ভাষায়, কোটিপতি ও শতকোটিপতিরা বুঝতে পারছেন, সন্তানদের বাস্তবতা তাঁদের নিজেদের সময়ের মতো নয়। তাই পরিবারগুলোকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, সন্তানকে সহায়তা করার অর্থ কী। শুধু সন্তানকে অর্থ দিয়ে নিশ্চিন্ত রাখা নয়, নতুন করে দক্ষতা শেখানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।

মায়ামিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যালাইন্ড বাই নিউএজ ওয়েলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডোয়ার। ধনীদের সঙ্গে তিনি কাজকারবার করেন। সাধারণত যাঁরা ১০ কোটি ডলার থেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিক, তাঁদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন ডোয়ার।

ডোয়ার জানান, তাঁর কাছে যাঁরা পরামর্শ চান, তাঁদের সন্তানদের বয়স সাধারণত ২২ থেকে ৩৫ বছর। তাঁর ভাষ্য, একসময় প্রযুক্তি, আইন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো পেশা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। সেখানেও তাঁরা এখন চাকরি পাওয়া ও ধরে রাখার লড়াইয়ে আছেন।

এতে ধনী পরিবারগুলো নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে। সন্তানেরা যদি সম্পদ গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে হয়তো মা–বাবাকে আগের চেয়ে বেশি সম্পদ রেখে যেতে হবে।

অর্থ আছে, তবু দুশ্চিন্তা কেন

অনেকের ধারণা, শতকোটিপতি ডলারের মালিক বাবা-মায়ের এ উদ্বেগ অযৌক্তিক। এসব মানুষের সন্তানের চাকরি না হলেও জীবন চালানোর মতো অর্থের অভাব হবে না।

কিন্তু সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা বলছেন, মূল উদ্বেগটা অর্থ নিয়ে নয়। থিগস বলেন, সাধারণত তাঁরা সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নন। তাঁরা ভাবছেন, সন্তানের জীবনের উদ্দেশ্যবোধ, পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস তাদের চাকরির বাজারের কী প্রভাব পড়বে।

আরেকটি ভয়ও আছে। সেটা হলো বিপুল সম্পদের কারণে যদি সন্তানের কাজ করার ইচ্ছা কমে যায়।

তাই সন্তানকে চিরকাল অর্থের জোগান দিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন না সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা; বরং তাঁরা বলছেন, উত্তরাধিকার, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সন্তান শুধু নিরাপদই না থাকে, নিজের ভবিষ্যৎও নিজে তৈরি করতে পারে।

থিগসের পরামর্শ, সন্তানকে শুধু ‘আর্থিক নিরাপত্তা’ দেওয়ার বদলে ভিন্ন ব্যবস্থা করতে হবে। যে ব্যবস্থায় সন্তান শেখার, বেড়ে ওঠার ও নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ সন্তানের সম্পদ কত হবে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি নিজেকে কতটা মূল্যবান মনে করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিডার পয়েন্ট ক্যাপিটাল পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ট্রেন্ট ভন আহসেন বলেন, অতিধনী পরিবারগুলোর দুশ্চিন্তা এখন আর্থিক স্থিতিশীলতা নয়; বরং অন্য কিছু। সেটা হলো সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাবে কি না, যাতে সে চিরকাল বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

বদলে যাচ্ছে জেন–জির ক্যারিয়ার ভাবনা

চাকরির বাজারের এই যে পরিবর্তন, জেন–জির ক্যারিয়ার ভাবনায় এর ছাপ পড়ছে। শোভন চাকরির ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাঁটাই, এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক তরুণ এখন প্রচলিত করপোরেট ক্যারিয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কনটেন্ট নির্মাতা হচ্ছেন। কেউ উৎপাদনশিল্পে যাচ্ছেন। কেউ বেছে নিচ্ছেন বৈদ্যুতিক বা অন্যান্য কারিগরি পেশা।

বিস্ময়কর মনে হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তরুণদের কেউ কেউ ধনী পরিবারের আয়া ও গৃহশিক্ষকের মতো চাকরি নিচ্ছেন। কেননা এসব চাকরির বার্ষিক বেতন লাখ ডলার। আবার করপোরেট চাকরির মতো অনিশ্চয়তা নেই।

ডেলয়েটের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, জেন–জির মাত্র ৬ শতাংশের লক্ষ্য হলো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যাওয়া। তাঁদের কাছে কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য, ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তি, নতুন কিছু শেখা—এসব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে শতকোটিপতিদের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা বদলাতে হচ্ছে। সন্তানকে একবারে বিপুল সম্পদ দিয়ে যাওয়ার বদলে শিক্ষা, পরামর্শ ও ধাপে ধাপে সম্পদ হস্তান্তর—এখন তাঁরা এসবে গুরুত্ব দিচ্ছেন।