এশিয়ার যেসব অতিধনী নিজেদের সম্পদ দান করছেন
এই ধনীদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় দান করছেন। অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদেরও সহায়তা করেন তাঁরা।
ইউরোপ ও আমেরিকার ধনীদের মতো এশিয়ার ধনীরাও দানধ্যান করেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমন ১৫ জন মানবতাবাদী ধনীর একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে।
ফোর্বস বলেছে, এই শত কোটিপতি ধনীরা নিজেদের আয়ের বড় একটি অংশ মানবকল্যাণে ব্যয় করছেন। যেমন জাপানের ধনী তাকেমিতসু তাকিজাকি নিজের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনে ২৬০ কোটি ডলার সমমূল্যের শেয়ার দান করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার এন্ড্রু ও নিকোলা ফরেস্ট ৩৩০ কোটি ডলার মূল্যের শেয়ার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান মিনডেরু ফাউন্ডেশনে দান করেছেন।
এই ধনীদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় দান করছেন। এ আই ডোন্ট মাই ডিয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হে জিয়াংজিয়ান ৪১ কোটি ডলার বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দান করার অঙ্গীকার করেছেন; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণায়ও এই অর্থ ব্যয় করা হবে। সেই সঙ্গে প্রবীণ মানবহিতৈষী লিকা সিং ৭৭ লাখ ডলার হংকংয়ের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেছেন; চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও গবেষণায় এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
ইন্দোনেশিয়ার শত কোটিপতি লো টাক কোং শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিত। তিনি লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসিকে ৭৩ মিলিয়ন বা ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার নিজের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দান করেছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের ধনীরা সচেতন। এ বিষয়েও তাঁরা দান করে থাকেন। হংকংয়ের নিউ ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্টের কর্ণধার আদ্রিয়ান চেং একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে কাজ করেন। অস্ট্রেলিয়ার শত কোটিপতি জেমস প্যাকার নিজেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুগছেন। তাই তিনি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণার জন্য অর্থ দান করেছেন।
এশিয়ার ধনীদের এই দানধ্যানের তালিকায় এবার নবসংযোজন ভারতের সবচেয়ে তরুণ বা কম বয়সী শত কোটিপতি নিখিল কামাত। দেশটির ধনীদের মধ্যে যে দান করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তিনি তার নবতম প্রতিনিধি।
এশিয়ার দানবীর এই ধনীদের যে তালিকা ফোর্বস ম্যাগাজিন তৈরি করেছে, সেখানে ক্রম তালিকা বা র্যাঙ্কিং করা হয়নি।
এবার শীর্ষস্থানীয় ছয়জন অতিধনীর দানের বিবরণ দেওয়া যাক:
অ্যান্ড্রু ফরেস্ট, চেয়ারম্যান ফরচেসকু মেটালস গ্রুপ ও নিকোলা ফরেস্ট, সহপ্রতিষ্ঠাতা মিনডেরু ফাউন্ডেশন
চলতি বছরের জুন মাসে এন্ড্রু ও নিকোলা ফরেস্ট ফোরচেসকু মেটালস গ্রুপের ২০ শতাংশ শেয়ার মিনডেরু ফাউন্ডেশনে দান করেছেন, যার অর্থমূল্য ৩৩০ কোটি ডলার। এটি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দানের ঘটনা।
ফাউন্ডেশন যেসব বিষয় নিয়ে কাজ করে, তার মধ্যে আছে শিশুদের শিক্ষা, আধুনিক দাসত্বের অবসান, আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের কর্মসংস্থানে সমতা ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা।
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে মিনডেরু ফাউন্ডেশন ফিলিস্তিনের গাজায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক মানুষের জন্য এক কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার মানবতাবাদী সাহায্য দিয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর এখন পর্যন্ত তারা ইউক্রেনের শস্যগুদাম ও জেনারেটর সুরক্ষায় ১ কোটি ৪০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার দান করেছে।
এক বিবৃতিতে নিকোলা বলেন, ‘সম্পদ অর্জনের চেয়ে পরিবার ও সমাজের জন্য কাজ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সে জন্য যেসব ক্ষেত্রে আমরা টেকসই পরিবর্তন আনতে পারব, সেই সব ক্ষেত্রে আমরা দান অব্যাহত রাখব।’
তাকেমিতসু তাকিজাকি, প্রতিষ্ঠাতা, কেয়েন্স
তাকেমিতসু তাকিজাকি গত বছর তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত কেয়েন্স ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে অসচ্ছল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রদের সহযোগিতা করতে ২৬০ কোটি ডলার দান করেছেন। ২০২০ সালে তিনি ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার শেয়ার দান করেন।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তাকিজাকি জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ও আন্তর্জাতিক আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রদের চার বছরের জন্য মাসে এক লাখ ইউয়ান করে সহযোগিতা করেন। আরেকটি বৃত্তির মাধ্যমে দুই হাজার ছাত্রকে বছরে তিন লাখ ইউয়ান দিয়ে থাকে এই ফাউন্ডেশন, সে তাদের আর্থিক অবস্থা যা–ই হোক না কেন। তাকিজাকি মনে করেন, ছাত্রদের এখন যা দেওয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। আরও বেশি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
হে জিয়াংজিয়ান, প্রতিষ্ঠাতা, মাইডিয়া গ্রুপ
হে জিয়াংজিয়ান শেনজেনভিত্তিক অ্যাপ্লায়েন্স প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাইডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। চলতি বছরের মে মাসে তিনি চীনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা খাতে ৩০০ কোটি ইউরো বা ৪১ কোটি ডলার দানের ঘোষণা দেন। এই অর্থ দিয়ে মাইডিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহীর তত্ত্বাবধানে হে সায়েন্স ফাউন্ডেশনের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে গবেষণা করবেন।
বিক্রম ক্রোমাদিত, চেয়ারম্যান, আমাতা গ্রুপ
থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শেয়ারবাজার নিবন্ধিত আমাতা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান বিক্রম ক্রোমাদিত চলতি বছরের মার্চ মাসে নিজের ৭০তম জন্মদিনে তিনি নিজের ৯৯ শতাংশ সম্পদ মৃত্যুর পর আমাতা ফাউন্ডেশনে দান করার ঘোষণা দেন। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনে তিনি এর আগে ২০০ কোটি বাথ সমমূল্যের সম্পদ দান করেন। আমাতা ফাউন্ডেশন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রদের ফলের ভিত্তিতে শিক্ষাবৃত্তি দেয়।
কে পি সিংহ, চেয়ারম্যান ইমেরিটাস, ডিএলএফ
ডিএলএফের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস কেপি সিং গত আগস্ট মাসে দিল্লিভিত্তিক এই আবাসন কোম্পানিতে তাঁর বাকি যে শেয়ার আছে, সেগুলো বিক্রি করে মানবকল্যাণে ব্যয় করার ঘোষণা দেন। ডিএলএফের শেয়ার বিক্রি করে তিনি ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেন। এর আগে ২০২০ সালে নবতিপর কেপি সিংহ ডিএলএফের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেন।