বিশ্বের সেরা ধনীর তালিকায় নিজেকে কেবল ছাড়িয়েই যাচ্ছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তাঁর সামনে এখন আর প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। গত ডিসেম্বরে ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইলন মাস্কের সম্পদমূল্য ৭০০ বিলিয়ন বা ৭০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর কদিন আগেই তাঁর সম্পদমূল্য ছাড়িয়ে যায় ৮০০ বিলিয়ন বা ৮০ হাজার কোটি ডলার। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কোথায় গিয়ে থামবেন ইলন।
বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস, ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইলন মাস্কের সম্পদমূল্য এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। যে গতিতে তাঁর সম্পদমূল্য বাড়ছে, তাতে এই পূর্বাভাস যে মোটেও ভিত্তিহীন নয়, তা বলাই বাহুল্য। সেই সঙ্গে ধনীদের তালিকায় মাস্কের পরে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে মাস্কের ব্যবধান এতটাই বেড়েছে যে বিষয়টি রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। দেখে নেওয়া যাক, আজ ফোর্বস ম্যাগাজিনের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ধনী কারা:
রব ওয়ালটন ওয়ালমার্ট প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের বড় ছেলে। স্যামের মৃত্যুতে ১৯৯২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালে চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসর নেন। উত্তরসূরি হিসেবে আসেন পুত্রবধূ গ্রেগ পেনার। ২০২৪ সালে রব ওয়ালটনের ওয়ালমার্টের পর্ষদ থেকেও অবসর নেন। স্যাম ওয়ালটনের অন্যান্য উত্তরাধিকারীসহ সামগ্রিকভাবে ওয়ালটন পরিবারের কাছে কোম্পানির প্রায় ৪৫ শতাংশ শেয়ার আছে।
ধনীদের এই তালিকা ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়। বিষয়টি নির্ভর করে মূলত শেয়ারের দামের ওপর। শেয়ারের দাম বাড়লে সম্পদমূল্য বাড়ে আর কমলে সম্পদমূল্য কমে—সে কারণে এই তালিকা প্রায় প্রতিদিনই বদলে যায়।
বাফেটের পরিচয় বিনিয়োগগুরু হিসেবে। কেউ কেউ বলেন, বাফেট যত ভালো বিনিয়োগকারী, তার চেয়েও ভালো ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক। বাফেট যেখানে বিনিয়োগ করেন আর যেভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালান, সেটাকেই আদর্শ মানা হয়। আসলে বিনিয়োগকারী হিসেবে তিনি কিংবদন্তিতুল্য আর ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রথম শ্রেণির। ওয়ারেন বাফেটের আরেকটি বড় পরিচয় হচ্ছে, তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনহিতৈষীদের একজন। ২০০৬ সালে তিনি তাঁর সম্পদের ৯৯ শতাংশই দানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির বড় অংশই দান করেছেন। তা না হলে বাফেটের সম্পদ আরও বেশি হতো। গত ৩১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাফেট। তবে কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন তিনি।
১৯৯৩ সালে চিপ কোম্পানি এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠা করেন জেনসেন হুয়াং। তখন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সিইও ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। এনভিডিয়ার প্রায় ৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক হুয়াং। ১৯৯৯ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। হুয়াংয়ের নেতৃত্বে এনভিডিয়া প্রথমে কম্পিউটার গেমিংয়ে এবং পরবর্তীকালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ২০২৫ সালে কোম্পানিটির বাজারমূল্য চার ট্রিলিয়ন বা চার লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে এআইয়ের জগতে চিপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম এনভিডিয়া। ফলে তিনি এই কোম্পানির আরও বাড়বাড়ন্ত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
৭৫টি ফ্যাশন ও কসমেটিকস ব্র্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত এলভিএমএইচ সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বার্নার্ড আর্নল্ট। এর মধ্যে লুই ভিতোঁ ও সেফোরার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড আছে। ২০২১ সালে এলভিএমএইচ ১৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের জুয়েলারি ব্র্যান্ড টিফানি অ্যান্ড কো. অধিগ্রহণ করে। বিলাসপণ্য খাতে ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় চুক্তি হিসেবে বিবেচিত। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল এলভিএমএইচ।
ল্যারি এলিসন সফটওয়্যার জগতের মহিরুহ কোম্পানি ওরাকলের চেয়ারম্যান, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) ও সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ৩৭ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০১৪ সালে তিনি ওরাকলের সিইও পদ ছাড়েন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওরাকলের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হন। তবে পরবর্তীকালে শেয়ারের দাম কমে যায়। এ ছাড়া তিনি মিডিয়া কোম্পানি প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের প্রায় ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক।
জেফ বেজোস ১৯৯৪ সালে সিয়াটলের নিজের গ্যারাজ থেকে ই-কমার্সের জগতের মহিরুহ প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২১ সালে তিনি এই কোম্পানির সিইও পদ ছেড়ে নির্বাহী চেয়ারম্যান হন। বর্তমানে কোম্পানিটির প্রায় ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক তিনি। ২০১৯ সালে ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে প্রথম স্ত্রী ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। সে সময় তিনি অ্যামাজনে নিজের ১৬ শতাংশ শেয়ারের এক-চতুর্থাংশ ম্যাকেঞ্জির কাছে হস্তান্তর করেন। তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার মালিক এবং রকেট কোম্পানি ব্লু অরিজিনেরও প্রতিষ্ঠাতা। ২০২২ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেজোস বলেন, জীবদ্দশায় নিজের সম্পদের বেশির ভাগই দান করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
২০০৪ সালে ১৯ বছর বয়সে মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে ফেসবুক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির প্রায় ১৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক তিনি। ২০২১ সালে মেটাভার্সে কোম্পানির মনোযোগ সরিয়ে নিতে ফেসবুকের নাম পরিবর্তন করে মেটা রাখা হয়। ২০১৫ সালে জাকারবার্গ ও তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান মেটায় তাঁদের শেয়ারের ৯৯ শতাংশ দান করার অঙ্গীকার করেন। গত পাঁচ বছরে ফেসবুকের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁসের অনেক অভিযোগ উঠেছে। সেই সংকট সামলে তিনি এখনো বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনীর একজন।
সের্গেই ব্রিন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অ্যালফাবেটের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা। রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্ট্যানফোর্ডে ল্যারি পেজের সঙ্গে গুগল গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও তিনি অ্যালফাবেটের পর্ষদে আছেন। পারকিনসনস রোগ গবেষণায় তিনি ১৫০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। তাঁর দাতব্য কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রজনিত রোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন।
ল্যারি পেজ গুগলের অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৮ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী পিএইচডি শিক্ষার্থী সের্গেই ব্রিনের সঙ্গে গুগল প্রতিষ্ঠা করেন ল্যারি পেইজ। ব্রিনের সঙ্গে মিলে তিনি গুগলের মূল চালিকা শক্তি পেজর্যাংক অ্যালগরিদম উদ্ভাবন করেন। একসময় তিনি গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন। তবে ২০১৯ সালে এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তিনি এখনো কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট গঠনের পর তিনি সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ৮০০ বিলিয়ন বা ৮০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি মাস্কের রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স তাঁরই মালিকানাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি এক্সএআই অধিগ্রহণ করেছে। এই অধিগ্রহণের পর মাস্ক এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ইলন মাস্ক সাতটি কোম্পানির সহপ্রতিষ্ঠাতা। এর মধ্যে আছে বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলা, রকেট উৎপাদনকারী কোম্পানি স্পেসএক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপ এক্সএআই ইত্যাদি।