সুইজারল্যান্ডের লুসান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মতো ৩৬টি বড় আয়োজনের মধ্যে ৩১টি আয়োজন লাভজনক হয়নি। গবেষণায় যে ১৪টি বিশ্বকাপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার মধ্যে কেবল একটির আয়োজন লাভজনক ছিল। আর সেটি ছিল ২০১৮ সালে রাশিয়ার ফুটবল বিশ্বকাপ। ওই বিশ্বকাপ থেকে রাশিয়া ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার মুনাফা করেছিল। মূলত বিশ্বকাপের প্রচারস্বত্ব বিক্রি করে এই মুনাফা করে দেশটি। তবে বিনিয়োগের বিপরীতে সেটা আবার খুব বেশি লাভজনক হয়নি, বিনিয়োগের বিপরীতে রাশিয়া ওই আয়োজন থেকে মুনাফা করেছিল মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের সব খরচ আয়োজক দেশের ঘাড়ে বর্তায়। ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ফিফা কেবল প্রতিযোগিতার পরিচালনব্যয় নির্বাহ করে। অথচ রাজস্ব আয়ের বড় অংশই ফিফার ঘরে যায়। টিকিট বিক্রি, পৃষ্ঠপোষকতা, সম্প্রচার স্বত্ব—সবকিছুই থাকে ফিফার হাতে। গত বিশ্বকাপ থেকে ফিফা ৫৪০ কোটি ডলার আয় করে। এ আয়ের একটি অংশ বিভিন্ন দেশকে দেওয়া হয়েছে।

লুসান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় শুধু স্টেডিয়াম নির্মাণ, উপকরণ ও মানবসম্পদ বাবদ খরচকে হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু একটি ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে আরও অনেক পরোক্ষ ব্যয় থেকে যায় যেমন কাতারের মেট্রো কাঠামো, নতুন নতুন হোটেল তৈরি ইত্যাদি। কিছু কিছু কাঠামো আবার দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য উপকারী। কিন্তু ব্যয়বহুল স্টেডিয়াম অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তীকালে অব্যবহৃত থেকে যায়। ফলে এ বিনিয়োগ অর্থনীতিকে খুব বেশি চাঙা করতে পারে না।

এই যখন বাস্তবতা, তখন এ ধরনের বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়ে দেশগুলোর অনাগ্রহ তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। সে জন্য দেখা গেল, ২০১৬ সালের অলিম্পিক আয়োজনের জন্য মাত্র সাতটি শহর নিলামে অংশ নেয়। আর ২০২৪ সালের অলিম্পিক আয়োজনের নিলামে অংশ নিয়েছে মাত্র দুটি শহর।

তবে এ রকম ব্যয়বহুল আয়োজনের ইতিহাস খুবই নতুন। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৬টি দল অংশ নেয়। ২০১৮ সালে করা হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের আয়োজনে ফুটবলারপ্রতি মাথাপিছু ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ডলার। আর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনে খরচের সেই অঙ্ক একলাফে উঠে গেল ৭০ লাখ ডলারে। প্রতিটি প্রতিযোগিতার জন্য নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করার যে রীতি চালু হয়েছে, সে কারণেই ব্যয় এতটা বেড়েছে। এবার কাতারে সাত-আটটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে একটি স্টেডিয়ামও তৈরি করতে হয়নি।

এ তো গেল অর্থনীতির বিষয়, মর্যাদার দিক থেকেও কাতার আগের বিশ্বকাপ আয়োজকদের সমপর্যায়ে যেতে পারেনি। এ কারণে এই বিশ্বকাপের আগে ব্রিটিশ মিডিয়ায় যত আলোচনা হয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ আলোচনায় ছিল নেতিবাচক বা সমালোচনামূলক। এমনকি এই বিশ্বকাপে স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের প্রায় সাত হাজার শ্রমিক মারা গেছেন, এ কারণেও কাতারের বদনাম হয়েছে। তা ছাড়া অ্যালকোহল ব্যবহার নিয়ে আয়োজকদের দ্বিচারিতাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কাতার যে বড় আয়োজক হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করল, সেটা তাকে প্রতিবেশীদের থেকে এগিয়ে রাখবে।