তেলের মতো প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ দেশ। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এসেছে এই দেশ থেকে। বাস্তবতা হলো, গ্যাস উৎপাদনে দ্বিতীয় ও পরের দেশগুলো থেকে তারা অনেকটাই এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) সর্বশেষ উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকায় শীর্ষ গ্যাস উৎপাদক দেশগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বৈশ্বিক গ্যাসের বাজার মূলত কয়েকটি বড় দেশের উৎপাদনের ওপরই নির্ভরশীল। তালিকাটি প্রণয়ন করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে তেলের মতো গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক দেশই নিরাপদ থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে যুক্তরাষ্ট্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৩৭ হাজার ৭৫১ বিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করেছে। এটি রাশিয়ার ১ দশমিক ৬ গুণের বেশি এবং ইরান ও চীনের সম্মিলিত উৎপাদনের কাছাকাছি। অন্য কোনো দেশ তার ধারেকাছে নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার ব্যবধানই শীর্ষ ১০-এর অনেক দেশের মোট উৎপাদনের চেয়ে বেশি। দেখে নেওয়া যাক, গ্যাস উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আর কারা আছে। ২০২৪ সালের উৎপাদনের ভিত্তিতে এই তালিক করা হয়েছে।
আলজেরিয়া উত্তর আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদক এবং ইউরোপের বড় সরবরাহকারী। পাইপলাইন ও এলএনজি—উভয় মাধ্যমেই তারা গ্যাস রপ্তানি করে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশটি ইউরোপীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সৌদি আরব ঐতিহ্যগতভাবে তেলনির্ভর হলেও সম্প্রতি গ্যাস খাতে নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। দেশটির গ্যাস উৎপাদনের বড় অংশ আসে ‘অ্যাসোসিয়েটেড গ্যাস’ থেকে, অর্থাৎ তেল উত্তোলনের সঙ্গে গ্যাস উৎপাদিত হয়। তবে ‘নন-অ্যাসোসিয়েটেড’ গ্যাস ক্ষেত্র—বিশেষ করে জাফুরা—উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে দেশটি। এই জাফুরা প্রকল্পটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শেল গ্যাস উদ্যোগ। উৎপাদিত গ্যাস মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ও পানীয় জল বিশুদ্ধকরণে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে দেশটি তেলের পরিবর্তে গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি করে অভ্যন্তরীণ খাতে জ্বালানিবৈচিত্র্য আনতে চায়। ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে গ্যাস খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সৌদি আরব অর্থনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সীমিত পরিসরে গ্যাস রপ্তানির দিকেও নজর দিচ্ছে তারা।
নরওয়ে শুধু বড় গ্যাস উৎপাদকই নয়, বরং ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত স্তম্ভ। দেশটির উৎপাদিত গ্যাসের বেশির ভাগই উত্তর সাগর ও নরওয়েজিয়ান সাগরের অফশোর ক্ষেত্র থেকে আসে। উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কল্যাণে গ্যাস উৎপাদন স্থিতিশীল আছে। ইকুইনরের মতো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কোম্পানি এ খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নরওয়ের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়েছে। পাইপলাইনভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থার কল্যাণে নরওয়ে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পাশাপাশি দেশটি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপদ্ধতি ও কার্বন নির্গমন কমানোর প্রযুক্তিতেও অগ্রগামী। এর ফলে ভবিষ্যৎ জ্বালানি রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে সে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অস্ট্রেলিয়া এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এলএনজি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগ ও প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানিনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কাতার বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গ্যাস রপ্তানিকারক, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে। দেশটির শক্তির ভিত্তি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত বিশাল নর্থ ফিল্ড। এই গ্যাসক্ষেত্র বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি এবং ইরানের সাউথ পার্স ক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত। কাতার দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ইউরোপের বাজারে স্থিতিশীল অবস্থান গড়ে তুলেছে। বর্তমানে ‘নর্থ ফিল্ড এক্সপ্যানশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করছে দেশটি। লক্ষ্য—আগামী কয়েক বছরে এলএনজি রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। উন্নত অবকাঠামো, কম উৎপাদন খরচ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহের কারণে বৈশ্বিক গ্যাসের বাজারে কাতার নির্ভরযোগ্য নাম।
কানাডা উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদক এবং তাদের উৎপাদনের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। দেশটির শক্তিশালী অবকাঠামো ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে উৎপাদন স্থিতিশীল। এ ছাড়া এলএনজি রপ্তানির সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এশিয়ার বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করছে তারা।
চীনের গ্যাস উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও তার শিল্প ও জ্বালানির চাহিদা আরও বাড়ছে। এর ফলে দেশটি একই সঙ্গে বড় উৎপাদক ও আমদানিকারক। অভ্যন্তরীণ উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি চীন পাইপলাইন ও এলএনজি আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
ইরানে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না দেশটি। দেশটির গ্যাসের বড় অংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। রপ্তানি সীমিত থাকায় বৈশ্বিক বাজারে তার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম, যদিও সম্ভাবনা বিশাল।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস মজুতকারী দেশ। দীর্ঘদিন তারাই ছিল ইউরোপের প্রধান সরবরাহকারী। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানি কমেছে। এর ফলে দেশটি এখন এশিয়ার বাজার, বিশেষ করে চীনের দিকে ঝুঁকছে। তবু অবকাঠামো ও বাজারবৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতায় রাশিয়ার প্রভাব কিছুটা কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক, তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি শেল গ্যাস–বিপ্লব। উন্নত প্রযুক্তি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিস্তৃত পাইপলাইন অবকাঠামোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস উৎপাদন স্থিতিশীল। দেশটি শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায় না, বরং এলএনজি রপ্তানির মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, বিশেষত ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন তারা রাশিয়া থেকে গ্যাস না কিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস কেনা বৃদ্ধি করে। চলমান ইরান যুদ্ধের কারণেও যুক্তরাষ্ট্র গ্যাসের নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠেছে।