টুইটার অধিগ্রহণের সময় ইলন মাস্ক বিনিয়োগকারীদের ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন

ইলন মাস্কছবি: রয়টার্স

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক সোশ্যাল মিডিয়া তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটার অধিগ্রহণের সময় তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকো শহরের একটি ফেডারেল আদালতে এমন রায় দিয়েছেন জুরি বোর্ড।

টুইটারে বিনিয়োগকারীদের একটি দলের দায়ের করা মামলায় জুরি বোর্ড চার দিনের শুনানি শেষে গতকাল শুক্রবার সর্বসম্মতভাবে এই রায় দেন। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, মাস্কের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেই তাঁরা টুইটারের শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। খবর বিবিসি ও সিএনবিসির

চলতি মাসের শুরুতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ইলন মাস্ক অবশ্য জানান, তিনি বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেননি। তাঁর মতে, মানুষ তাঁর বক্তব্য ও টুইটকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে।

এই রায়ের ফলে ইলন মাস্কের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। জরিমানার এই অর্থ বাংলাদেশের প্রায় ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৫০ পয়সা ধরে)।

জুরি বোর্ড মনে করেন, টুইটার ব্যবহারকারী–সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্য এবং ৪৪ বিলিয়ন ডলারের অধিগ্রহণ চুক্তি থেকে সরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে ইলন মাস্ক ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিলেন। গুরুত্বের দিক থেকে মাস্কের বক্তব্য ছিল ভুয়া এবং তা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। এতে কিছু বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা তিনি করেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বসের সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি তালিকায় শীর্ষস্থান পান ইলন মাস্ক। বর্তমানে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য ৮৩৯ বিলিয়ন বা ৮৩ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনিই ৮০০ বিলিয়ন বা ৮০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের সম্পদের মালিক হন। ইলন মাস্ক রকেট নির্মাতা ও মহাকাশ ভ্রমণ সংস্থা স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টেসলা মোটরসের সিইও, সোলারসিটির চেয়ারম্যান, নিউরালিংক ও ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান এবং পেপ্যালের একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা।

২০২২ সালের অক্টোবরে ‘পাম্পেনা বনাম মাস্ক’ নামের এই মামলা করা হয়। সে সময় মাস্ক টুইটার কিনে প্রতি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করেন ৫৪ ডলার ২০ সেন্ট। পরে তিনি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘এক্স’ এবং এটির সিইও পদ নেন তিনি। পরবর্তী সময় এটিকে নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান এক্সএআই ও রকেট তৈরির প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত করেন মাস্ক।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জোসেফ কচেট বলেন, এই মামলার মূল বিষয় ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ। তাঁর ভাষায়, ‘যাঁদের অবসর ভাতা, সঞ্চয় বা পেনশন তহবিলের ওপর নির্ভরতা আছে, তাঁদের সঙ্গে কী করা উচিত নয়, এটি তার একটি বড় উদাহরণ।’

অন্যদিকে মাস্কের আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, জুরির রায়ে যেমন বাদীপক্ষের কিছু দাবি গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি কিছু প্রত্যাখ্যানও করা হয়েছে। তাঁরা এটিকে সাময়িক বাধা হিসেবে দেখছেন এবং আপিলে নিজেদের পক্ষে রায় পাওয়ার আশা করছেন।

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে টুইটার কেনার প্রস্তাব দেওয়ার পর মাস্ক দ্রুতই চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি প্ল্যাটফর্মে ভুয়া ও স্প্যাম অ্যাকাউন্টের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মে মাসে এক টুইটে তিনি জানান, এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে, যতক্ষণ না টুইটার তাদের হিসাব অনুযায়ী ভুয়া অ্যাকাউন্টের হার প্রায় ৫ শতাংশ প্রমাণ করতে পারে।

মাস্কের এসব মন্তব্যের পর একদিনেই টুইটারের শেয়ারের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়।

সাবেক টুইটার শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, মাস্কের এসব মন্তব্য ছিল একটি কৌশল, যাতে তিনি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে কম দামে বিক্রি করতে চাপ দিতে পারেন। তাঁদের মতে, সে সময় মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় টুইটার অধিগ্রহণের অর্থ জোগাতে আরও বেশি শেয়ার বিক্রি করতে হতো, এই চাপ থেকেই তিনি এমন করেছেন।

বাদীপক্ষ আরও জানায়, মাস্কের বক্তব্যের প্রভাবে অনেক বিনিয়োগকারী ৫৪ ডলার ২০ সেন্টের কম দামে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হন।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের ফলে শেয়ারের দামে যে প্রভাব পড়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হতে প্রায় ৯০ দিন লাগবে। এরপর আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ পেতে।

মাস্কের পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি হলো, তাঁর মন্তব্যগুলো টুইটারের ভুয়া ও স্প্যাম অ্যাকাউন্ট নিয়ে যুক্তিসংগত উদ্বেগের ভিত্তিতে করা হয়েছিল। এগুলো শেয়ারবাজারে প্রতারণা বা শেয়ারের দাম কমানোর পরিকল্পনা ছিল না।

এই রায় মাস্কের জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও তাঁর বিপুল সম্পদের তুলনায় এর আর্থিক প্রভাব সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে।