দেশে-বিদেশে সোনার দামে নাটকীয়তা, শেষ কোথায়
দেশে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি বেড়ে ২ লাখ ৮৬ হাজারে ওঠে, এখন ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৯ টাকায় নেমেছে।
বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সাড়ে ৫ হাজার ডলার ছাড়ানোর রেকর্ড করে আবার ৪ হাজার ৮৯৩ ডলারে নেমেছে।
বিশ্ববাজারে দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও সোনার দাম কমছে। গত সপ্তাহে অবশ্য বিশ্ববাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর দেশের বাজারেও সোনার দাম সর্বকালীন রেকর্ড গড়ে।
বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে শুক্র ও শনিবার দেশের বাজারে সোনার দাম ভরিতে ৩০ হাজার টাকার বেশি কমেছে।
নাটকীয়তা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে গত সপ্তাহে রোববার থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত মোট ছয়বার সোনার দামে উত্থান-পতন ঘটেছে। এই ছয়বারের মধ্যে চারবার সোনার দাম বেড়েছে। কমেছে দুবার। গত ২৫ জানুয়ারি রোববার সোনার দাম ভরিতে দেড় হাজার টাকা বেড়ে হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা। পরদিন সোমবার রাতে সোনার দাম ভরিতে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বাড়ানো হয়। গত বুধবার সকালে দাম বাড়ে ৭ হাজার ৩৪৮ টাকা। বৃহস্পতিবার সকালে আবারও সোনার দাম বাড়ে ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা।
শুক্রবার সোনার দাম ভরিতে ১৪ হাজার ৬৩৮ টাকা কমে। গতকাল শনিবার সকালে কমে আরও ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা। তাতে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা এখন বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকায়। গত রোববারও দাম বাড়ার আগে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ভরি ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, দেশে গত সপ্তাহজুড়ে চরম নাটকীয়তার পর সোনার দাম আগের জায়গায় ফিরেছিল। কিন্তু শনিবার রাতে আবার দাম বাড়ানো হয়। এ দফায় ভরিতে বেড়েছে ৪ হাজার ৮২ টাকা। তাতে ভালো মানের অর্থাৎ, ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৯ টাকা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল ২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার ভরিপ্রতি দাম কমেছে যথাক্রমে ১৪ হাজার ৯৮৮ ও ১২ হাজার ৮৮৮ টাকা। তাতে ২১ ক্যারেটের দাম হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা ভরি। ১৮ ক্যারেটের দাম হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা। এদিকে সনাতন পদ্ধতির সোনার ভরি ১০ হাজার ৯৬৪ টাকা কমে ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকায় নেমেছে।
করোনার পর গত পাঁচ বছরে দেশে-বিদেশে সোনার দাম দ্রুত বেড়েছে। দেশের বাজারে ২০২৩ সালের ২১ জুলাই সোনার ভরি ১ লাখ টাকায় পৌঁছায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ ও অক্টোবরে দুই লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। গত সপ্তাহে আড়াই লাখ টাকা পেরিয়ে যায় সোনার দাম।
বিশ্ববাজারে হঠাৎ কেন কমল
বিশ্ববাজারে গত সপ্তাহে একপর্যায়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোনার আউন্সপ্রতি দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইতিমধ্যে দাম কমে অবশ্য ভরিপ্রতি ৪ হাজার ৮৯৩ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৬০০ ডলারের বেশি কমেছে।
বিবিসির সংবাদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমতে শুরু করেছে। উত্তেজনা কিছুটা কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা অনেকটাই বেশি।
গত সপ্তাহে সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প কাকে তাঁর দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নেন, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। বাজারের আশঙ্কা ছিল, তিনি এমন একজনকে ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করতে পারেন, যিনি সুদের হার কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ মেনে নেবেন। এতে ডলারের মান কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতেই বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝুঁকেছিলেন।
কিন্তু ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্প কেভিন ওয়ারশকে মনোনয়ন দিতে পারেন—এই খবর আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় তাঁকে তুলনামূলকভাবে ‘নিরাপদ’ হিসেবে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। এ খবরে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের দাম একযোগে কমে যায়।
বিষয়টি হলো, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিদ্যমান ও সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত অব্যাহত থাকায় ‘সেফ হ্যাভেন’ বা ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ হিসেবে সোনা ও রুপার আকর্ষণ এখনো অটুট।
কোথায় যাবে সোনার দাম
পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় সোনার এই দাম হ্রাস সাময়িক বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। সোনার দাম যেদিন ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, সেদিনই রয়টার্সের সংবাদে বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেন, কয়েকটি কারণে সোনার দামে সাময়িকভাবে কিছুটা সংশোধন আসতে পারে। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রে সুদ কমানোর প্রত্যাশা কমে যাওয়া অথবা ফেডের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রশমিত হওয়া।
বেশির ভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, দাম কমলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং বিনিয়োগকারীরা সেই পরিস্থিতিকে সোনা কেনার সুযোগ হিসেবেই দেখবেন।
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। গড় দাম হতে পারে ৪ হাজার ৭৪২ ডলার। অন্য যেসব সংস্থা পূর্বাভাস দিচ্ছে, তারাও বলছে, সোনার দাম চলতি বছর ৫ হাজার ডলারের ওপরেই থাকবে।