চলমান সংকটে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ইউরো জ্বালানিসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্য দিচ্ছে জিডিপির ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ক্রোয়েশিয়া দিচ্ছে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, গ্রিস ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ, জার্মানি ২ দশমিক ৮১ শতাংশ, ফ্রান্স ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সম্প্রতি ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের জ্বালানি তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ জ্বালানি ভর্তুকি হিসেবে মানুষকে সরাসরি দেওয়া হবে।

সরকারের সক্ষমতা

কথা হচ্ছে, কেন আমাদের মতো দেশের সরকার নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ কিছু করছে না? এক কথায় এর উত্তর হলো, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ কতটা জনমুখী নীতি অনুসরণ করতে পেরেছে, তার প্রধান নির্দেশক হলো জাতীয় আয় বা জিডিপির তুলনায় সরকারি রাজস্বের অনুপাত। যে নরওয়েকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের আদর্শ হিসেবে ধরা হয়, সেখানে রাজস্ব আয় জিডিপির অর্ধেকের বেশি।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অন্যান্য দেশের রাজস্ব আয়ের অনুপাতও এর কাছাকাছি। এর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপের জার্মানি ও ফ্রান্সকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু এর ব্যতিক্রম, যদিও বড় অঙ্কের ঘাটতি বাজেট দিয়ে এ দুটি দেশও সরকারি ব্যয়কে জিডিপির ৪০-৫০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছে।

সে তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেকটাই পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় শুধু ভারত আর নেপালে ২০ শতাংশের কাছাকাছি, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশ বা তারও কম। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা জনতুষ্টিবাদী হতে গিয়ে কর রেয়াত ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে বিপদে পড়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, বিদেশ থেকে ধার করা অর্থে জনতুষ্টি করতে গেলে দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে বামপন্থী সরকার ক্ষমতায়, তাদের অবস্থাও আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও বলিভিয়ার মতো দেশে রাজস্ব আয়ের অনুপাত অন্তত ৩০ শতাংশে উন্নীত করা গেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ১০ শতাংশের নিচে রাজস্ব আয় দিয়ে জনগণকে নগদ সহায়তা দেওয়া বা জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়ার মতো চিন্তা করাও দুঃসাধ্য, বরাদ্দের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়টি বিবেচনা না করেও কথাটি বলা যায়।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, দেশের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে। অর্থাৎ যাঁরা ধনবান, তাঁরা কর দেন কম; বরং করভারের বড় অংশ বহন করছে সাধারণ মানুষ। শুল্ক ও বিভিন্ন ধরনের ভ্যাট থেকে আসছে এই রাজস্ব।

কোভিড মোকাবিলা

বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় জিডিপির ৪ শতাংশের ওপরে প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো যেখানে ব্যবসা বাঁচানোর পাশাপাশি মানুষকে সরাসরি নগদ প্রণোদনা দিয়েছে, দেশে সেটা তেমন একটা হয়নি। তবে ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষকে দুইবার সরাসরি আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে সবাইকে তা দেওয়া যায়নি।

মূলত ঋণ দেওয়া হয়েছে দেশে। বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এ প্রণোদনার ঋণ পেয়ে ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত পিছিয়ে আছে। তাদের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা-ও পুরোপুরি বিতরণ করা যায়নি নথিপত্রের সমস্যার কারণে, যদিও দেশের বেশির ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান কোভিডের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

কীভাবে আয় বাড়বে

সরকারের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে রাজস্ব-প্রত্যক্ষ কর ও পরোক্ষ কর। আগেই বলা হয়েছে, দেশে পরোক্ষ করের অনুপাত অনেক বেশি। তাই প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধিতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার কর নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। বলা দরকার, শিল্পোন্নত দেশগুলোতে উচ্চ হারে এ ধরনের করারোপ করা হয়। এমনকি অধিকাংশ স্বল্পোন্নত দেশে সম্পদ করও নেই বা থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। ফলে আমাদের মতো দেশে বংশানুক্রমিকভাবে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।

বিশেষত যেসব ধনসম্পত্তি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবর্তে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, সেগুলো উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ যতটা হয়, তার চেয়ে বিভিন্ন ধরনের স্থাবর সম্পত্তি কেনায় বেশি ব্যয় হয়। এ ধরনের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে উচ্চ হারে কর আরোপিত হলে বাজার অর্থনীতির প্রণোদনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি সাম্প্রতিক এক ব্লগে লিখেছেন, ২০ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অণুক্রমিক করব্যবস্থা (যার যত বেশি আয়, তার কর হার তত বেশি) অত্যন্ত সফল ছিল। ১৯৩০-৮০ সাল পর্যন্ত সে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষের আয়কর ছিল ৮০-৯০ শতাংশ। ঠিক সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তখন সে দেশে আজকের মতো বৈষম্য ছিল না এবং শিক্ষায় তারা সবচেয়ে এগিয়ে ছিল।

সে জন্য তাঁর মত, শতকোটি ডলারের মালিকদের ওপর ৮০-৯০ শতাংশ করারোপ করা হোক। আর সেই অর্থের বড় অংশ সরাসরি দরিদ্র দেশগুলোতে পাঠানো হোক।
সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি চূড়ান্ত বিচার রাজনৈতিক। এ জন্য কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য ভাঙতে হবে, বিশ্লেষকেরা তেমনটাই মনে করেন।