ভারতের ট্রানজিট প্রস্তাব
নেপাল ও ভুটানে রপ্তানি বাড়বে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিনা মাশুলে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্টের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
বাংলাদেশকে ভারত বিনা মাশুলে তাদের স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য পরিবহনের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট হিসেবেই বেশি পরিচিত। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ মূলত নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহনে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাবে। বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটানে যেতে পারবে। এতে দেশ দুটিতে পণ্য রপ্তানি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ভারতের প্রস্তাবে আপাতত নেপাল ও ভুটানে বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ বেড়েছে। ২০১৫ সালেই অবাধ যান চলাচল চুক্তি হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর করলেই সংশ্লিষ্ট সব দেশ একসঙ্গে সুবিধা পেত।মোস্তাফিজুর রহমান, বিশেষ ফেলো, সিপিডি
বর্তমানে ভারতের কোনো স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য নিতে পারে না বাংলাদেশ। নেপাল ও ভুটান ভূবেষ্টিত দেশ হওয়ায় সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ নেই। ভারতের স্থলপথে ভারতের ভূখণ্ড ও আকাশপথে তাদের বিমানবন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ নিতে পারবে বাংলাদেশ। বর্তমানে নেপাল ও ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ সীমান্তে এসে আমদানি–রপ্তানি উভয় ধরনের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পায়।
এ ছাড়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ি এবং বিরল সীমান্ত দিয়ে রেলপথে ভারতের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট–সুবিধা নিয়ে ওই দুটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির নিকটবর্তী বাগডোগরা বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে অবাধ যান চলাচল যুক্তি হয়। ভুটান ছাড়া সব দেশ তা অনুমোদন করেছে। ওই চুক্তির আওতায় অবাধে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের কথা। ইতিমধ্যে কীভাবে যান চলাচল করবে, সেই প্রটোকল এবং নিয়মকানুনের খসড়াও তৈরি হয়েছে। এখন ভারতের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট প্রস্তাবের বিষয়টি এই উদ্যোগে নতুন মাত্রা পেল।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারতের প্রস্তাবে আপাতত নেপাল ও ভুটানে বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ বেড়েছে। ২০১৫ সালেই অবাধ যান চলাচল চুক্তি হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর করলেই সংশ্লিষ্ট সব দেশ একসঙ্গে সুবিধা পেত। বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি নেপাল চলে যেতে পারত।’ তিনি মনে করেন, ভারতের নতুন প্রস্তাব কার্যকর করা হলে বাংলাদেশের জন্য পণ্য রপ্তানিতে আরও কিছু সুযোগ তৈরি হবে। যেমন একবার রাজধানীর বিমানবন্দরে পণ্যজটের কারণে বিশেষ ব্যবস্থায় কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের বাজার বাড়বে
নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ওয়ালটন, আসবাবপত্রের প্রতিষ্ঠান হাতিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নেপালে পণ্য রপ্তানি করে। রপ্তানি তালিকায় রয়েছে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, আসবাব, খাদ্যজাত পণ্য ইত্যাদি। অন্যদিকে ভুটানে যায় জুস, ড্রিংক, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য।
নেপালে রপ্তানি করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এই গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের প্রস্তাবটি বিস্তারিত জানা গেলে রপ্তানিকারকেরা কতটা লাভবান হবেন বলা যাবে। যদি বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক সরাসরি নেপালে যেতে পারে, তাহলে খরচ, সময় ও হয়রানি কমবে। তিনি আরও বলেন, এখন বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়ে এক ট্রাক থেকে পণ্য নামিয়ে আরেক ট্রাকে উঠাতে হয়। বিভিন্ন সীমান্তে বারবার পণ্যের চালান খুলে দেখা হয়। এতে পণ্যের মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নেপালে এখন প্রতি মাসে প্রাণের ৮ থেকে ১০ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়। ভারতের প্রস্তাবিত ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টের মাধ্যমে যাত্রাপথ মসৃণ হলে রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে নেপালে পণ্য রপ্তানি করতে হলে প্রথমে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে পণ্যের চালান নিতে হয়। সেখান থেকে নেপাল বা ভারতীয় ট্রাকে করে সেই দেশের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে ভারতের পানির টাংকি-নেপালের কাকরভিটা সীমান্তে পণ্য যায়। এভাবে ভারতের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কাঠমান্ডু বা অন্য কোনো স্থানে পণ্য পৌঁছে। স্থলপথে একইভাবে ও একই প্রক্রিয়ায় নেপাল থেকে পণ্য আমদানি হয়। নেপাল থেকে প্রধানত ডাল আমদানি হয়।
আবার ভুটানে পণ্য রপ্তানি করতে হলে বুড়িমারী সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাক যায়। পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে জয়নগর-ফুয়েন্টশিলিং সীমান্ত দিয়ে ভুটানে প্রবেশ করে ট্রাক।
ঢাকায় নেপাল দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৬৭ কোটি নেপালি রুপির সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে নেপাল থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৬৭ কোটি রুপির পণ্য এসেছে।
ভারতকে আগেই ট্রানজিট দিয়েছে বাংলাদেশ
স্বাধীনতার পরপরই নৌ প্রটোকলের আওতায় ভারত বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে পণ্য নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ২০১৬ সালে কলকাতা থেকে নৌপথে আশুগঞ্জ নৌবন্দর পর্যন্ত; পরে সড়কপথে আখাউড়া হয়ে আগরতলায় বহুমাত্রিক ট্রানজিট দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিটের পরীক্ষামূলক চালানও গেছে।