ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সরকারি নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি গ্রহণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও মতামত নেওয়া হলে তাতে নীতি বাস্তবায়ন সহজ হয়। ব্যবসায়ীরা তাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মতামত দিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীও ব্যবসায়ীদের এই পরামর্শের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বেসরকারি খাত পরামর্শক কাউন্সিলের প্রথম সভায় কাউন্সিলের ব্যবসায়ী সদস্যরা এ মত দেন। শনিবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নানা বিষয় নিয়ে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী কাউন্সিলের প্রথম সভা হয়।
সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অংশ নেন ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুল জব্বার, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, এপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, এসিআইয়ের এমডি আরিফ দৌলা, বে গ্রুপের এমডি জিয়াউর রহমান, র্যাংগ্স গ্রুপের এমডি সোহানা রউফ চৌধুরী ও প্যাসিফিক জিনসের এমডি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সভায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা তাঁদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব করেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত, বন্দর–সুবিধা উন্নত, ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো, ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোসহ নানা বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ধৈর্যসহকারে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শোনেন। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেন। আর কিছু বিষয়ে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব চান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিরা।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ও বিমা খাতে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁরা বলেন, বর্তমানে দেশে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যাংক রয়েছে। ব্যাংক খাতের সমস্যার এটিও একটি বড় কারণ। এ অবস্থায় কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি এ দেশের এক বা একাধিক ব্যাংক অধিগ্রহণে আগ্রহী হয়, তাহলে তাদের জন্য সেই সুযোগ উন্মুক্ত করা দরকার। একইভাবে সরকারি বিভিন্ন মিল, কলকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ারও পরামর্শ দেন তাঁরা। সেই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শও দেন তাঁরা। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের চাপ কমাতে সংস্কারের মাধ্যমে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে তাগিদ দেন ব্যবসায়ীরা।
বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধীরগতি নিয়েও অসন্তোষ তুলে ধরেন বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ–সংযোগসহ নানা সুবিধার নিশ্চয়তা পেয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছিলেন। অনেক উদ্যোক্তা এ খাতে বিপুল অর্থও বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতিও থমকে আছে। অনেক কারখানায় বিনিয়োগ করে সেগুলো চালু করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের এমডি আবদুল জব্বার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করণীয় ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো আমরা বৈঠকে তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের সেসব পরামর্শ শুনেছেন। কিছু বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিন মাস পরপর কাউন্সিলের বৈঠক করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয় প্রথম বৈঠকে।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এ ক্ষেত্রে দরকার হলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের এই দাবির প্রতিও নীতিগতভাবে একমত পোষণ করা হয়। সেমি কন্ডাক্টরসহ জ্ঞাননির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য এ খাতে সরকারের প্রণোদনার সুপারিশও করেন ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে এপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সংযোগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এই কাউন্সিল গঠন ও বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এটি সবে শুরু। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তিন মাস পরপর কাউন্সিলের বৈঠক হবে। গতকালের বৈঠকে আমরা ব্যবসা–বাণিজ্যের বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছি। আমরা বলেছি, বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা গেলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা–বাণিজ্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’