বিসিক কার্যালয় থেকেই ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে, কারা পাবেন
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) থেকে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে কোনো ধরনের জামানত লাগে না। এই ঋণের সুদহারও বেশ কম।
বিসিকের এই ঋণ পেতে হলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় না। দেশের ৬৪টি জেলায় থাকা বিসিক কার্যালয়গুলোয় আবেদনের মাধ্যমে যেকোনো সময় সরাসরি এই ঋণ নেওয়া যায়।
বিসিকের যত ঋণ কর্মসূচি
বর্তমানে বিসিকের তিন ধরনের ঋণ কার্যক্রম রয়েছে। এক. প্রণোদনা প্যাকেজ ঋণ কর্মসূচি। করোনার পরপর ২০২০–২১ অর্থবছর থেকে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে এই কর্মসূচি চালু হয়। পরে এটি পুনঃ অর্থায়ন তহবিলে রূপ নেয়। গত জুন পর্যন্ত এই তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। এই তহবিল থেকে ৯ হাজার ২৯১ জন ঋণ পেয়েছেন।
উদ্যোক্তাদের জন্য ২০১৫–১৬ অর্থবছর থেকে নিজস্ব অর্থায়নে একটি ‘বিনীত’ (বিসিক নিজস্ব তহবিল) ঋণ কর্মসূচি চালু করে। মাত্র ১৫ কোটি টাকা দিয়ে শুরু করা তহবিলের আকার এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি টাকায়। গত জুন পর্যন্ত এই তহবিল থেকে ৮ হাজার ৮৭৩ জন ঋণ পেয়েছেন।
প্রান্তিক পর্যায়ের মৌচাষিদের জন্য ২০১৯ সাল থেকে আলাদা একটি ঋণ কর্মসূচি চালু করেছে বিসিক। এই তহবিলের আকার বর্তমানে ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এখান থেকে মৌচাষিরা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পেয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯৭ জনকে এই ঋণ দিয়েছে বিসিক।
বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, সব কটি কর্মসূচির ক্ষেত্রেই ঋণের সুদহার ও অন্যান্য প্রক্রিয়া একই।
ঋণের পরিমাণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া
উদ্যোক্তারা ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, শিগগিরই ঋণের এই সীমা বাড়ানো হতে পারে।
সব ঋণের অনুমোদন বিসিকের জেলা কার্যালয় দিতে পারে না। উদ্যোক্তাদের আবেদনের ভিত্তিতে বিসিক জেলা কার্যালয় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা ভাগ করা রয়েছে। বিসিকের জেলা কার্যালয় সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করতে পারে। ৫ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন দিতে পারে আঞ্চলিক কার্যালয়। আর ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি হলে (২০ লাখ টাকা পর্যন্ত) অনুমোদন দেয় বিসিকের প্রধান কার্যালয়।
ঋণের শর্ত কী
বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, সংস্থাটি থেকে দেওয়া দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সম্পূর্ণ জামানতমুক্ত। এ ক্ষেত্রে শুধু একজন জামিনদার (গ্যারান্টার) থাকলেই এই ঋণ পাওয়া যায়।
দুই লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে ‘ইকুইটেবল মর্টগেজ ডিড’র মাধ্যমে উদ্যোক্তার নিজস্ব জমি বা বাড়ির কাগজপত্র বিসিক কার্যালয়ে বন্ধক রাখতে হয়। কোনো ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষের জটিলতা ছাড়া এই কাজ বিনা খরচে বিসিক কার্যালয়েই সম্পন্ন হয়। ঋণ পরিশোধের পর উদ্যোক্তা কাগজপত্র ফেরত পান।
বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২–এ বর্ণিত যেকোনো ধরনের শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারে। তবে নতুন উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, বিসিক শিল্প নগরীর শিল্প প্লটের মালিক ও উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সুদের হার ও মেয়াদ
বিসিকের ঋণ কর্মসূচিতে সুদের হার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুলভ। নারী উদ্যোক্তাদের মাত্র ৫ শতাংশ সুদহারে এই ঋণ দেওয়া হয়। আর পুরুষ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ৬ শতাংশ। এক বছর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদে এই ঋণ পরিশোধের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে সাধারণ ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের তুলনায় অনেক কম সুদে বিসিক থেকে ঋণ নিতে পারেন উদ্যোক্তারা।
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ ইকুইটি এবং নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ইকুইটি নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোক্তার বিনিয়োগকৃত জমি, কারখানা ঘর, যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক স্থায়ী বিনিয়োগ ইকুইটি হিসেবে দেখানো যাবে। একক অথবা অংশীদারি মালিকানা উভয় ক্ষেত্রে ঋণ পেতে পারেন।
আবেদনের নিয়ম
উদ্যোক্তারা বছরের যেকোনো সময় বিসিকের জেলা কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঋণের জন্য সরাসরি আবেদন করতে পারবেন। কোন উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, যেমন নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, পরিচালন মূলধন, নাকি বিপণন (মার্কেটিং) খরচ, তা যাচাই–বাছাই করে বিসিকের কর্মকর্তারা ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
ঋণ আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে ঋণ আবেদনপ্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করার নিয়ম রয়েছে।
কারা ঋণ পাবেন
ঋণগ্রহীতাকে (উদ্যোক্তা) বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। তিনি জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হবেন অথবা আন্তজেলায় তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। উদ্যোক্তার বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ গ্রাহক হিসেবে চিহ্নিত হলে এ ঋণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
ঋণগ্রহীতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিসিক জেলা কার্যালয়, বিসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিসিক নকশা কেন্দ্র ও বিসিক থেকে মৌমাছি পালনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার যুবক ও যুব নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।