কোরবানির হাটে ক্যাশলেস লেনদেন
ঘনিয়ে আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই উৎসবের কথা মনে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোরবানির পশুর হাটের পরিচিত দৃশ্য। পশুর হাট মানেই একসময় ছিল বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার ছড়াছড়ি। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি, ছিনতাইকারীর ভয় ও জাল নোটের প্রতারণা—এসব কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই তটস্থ থাকতে হতো। তবে সময় বদলেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে কোরবানির পশুর হাটে এখন ডিজিটাল বা ক্যাশলেস লেনদেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে চলছে পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি। এই হাটগুলোতে শত শত কোটি টাকার ক্যাশলেস লেনদেন নিরাপদে পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশে পশু কেনাবেচায় ডিজিটাল লেনদেন এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
সাধারণত ঈদের পশুর হাটের ব্যাপারী ও খামারিরা সব সময় জাল টাকা ও প্রতারণার চরম ঝুঁকিতে পড়েন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের স্মার্ট সেবার আওতায় আনা হয়েছে। এসব স্মার্ট হাটে ডিজিটাল বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এখন আর পকেটে করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে হাটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। হাটের ডিজিটাল বুথের মাধ্যমে ভিসা কার্ড, মাস্টারকার্ড, বিকাশ ও নগদের মতো মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতারা সম্পূর্ণ নিরাপদে লেনদেন করতে পারছেন।
দেশজুড়ে স্মার্ট পশুর হাট
প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানান, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসছে। ঈদে কোরবানির জন্য ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি উপযুক্ত পশু রয়েছে, যা চাহিদার চেয়ে ২২ লাখের বেশি উদ্বৃত্ত পশু আছে বলে জানান মন্ত্রী।
ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি মহানগরীতে ৩০টি হাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বসানো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অস্থায়ী ক্যাম্প। এতে শুধু ক্যাশলেস লেনদেনই নয়, সার্বিক নিরাপত্তার জন্য থাকছে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন, এটিএম বুথ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা। রাজধানী ঢাকায় এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১১টিসহ মোট ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল সেবার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
কোরবানির হাটে ক্যাশলেস লেনদেনের বিপ্লব এক দিনে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০২২ সাল থেকে গবাদিপশুর হাটে ডিজিটাল লেনদেন সেবা চালু হয়। শুরুর বছরটিতে ঢাকার মাত্র ছয়টি হাটে ছয়টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করেছিল। ২০২৫ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৯টি হাটে ১৪টি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে। ওই বছর ক্যাশলেস লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি টাকার বেশি।
রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে সুষ্ঠুভাবে নোট যাচাই সেবা প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংককে দায়িত্ব দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উল্লেখযোগ্য এলাকায় গাবতলী স্থায়ী হাটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, উত্তরা দিয়াবাড়ির বউবাজারে ব্র্যাক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক এবং মেরুল বাড্ডায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক কাজ করবে। এ ছাড়া ঢাকা পলিটেকনিক এলাকায় আইএফআইসি ও মেঘনা ব্যাংক এবং মিরপুর সেকশন-৬-এ সীমান্ত, এবি ও ন্যাশনাল ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উল্লেখযোগ্য এলাকার সারুলিয়া হাটে দি প্রিমিয়ার, উত্তরা ও ডাচ্বাংলা ব্যাংক এবং শাহজাহানপুরে ঢাকা, রূপালী ও জনতা ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শ্যামপুর কদমতলীতে যমুনা ব্যাংক, গোলাপবাগ আউটফলে মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং দয়াগঞ্জ থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত যাচাই কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে সোনালী ব্যাংক। এ ছাড়া এসব হাট ঘিরে এমএফএস সেবা প্রতিবছরের মতো এবারও চালু থাকবে।
ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনের এই উদ্যোগ কোরবানির পশুর হাটের চিরচেনা চিত্রকে বদলে দিচ্ছে।