>

স্বাধীনতার পর গত ৪৬ বছরে অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। আবার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে না পারার অতৃপ্তিও আছে। বিজয় দিবস সামনে রেখে এসব বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকার ও আশরাফুল ইসলাম
প্রথম আলো: স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কোন অবস্থানে আছে?
সায়মা হক বিদিশা: ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অনেকগুলো সূচকে বাংলাদেশের বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছর লেগে গেছে অর্থনীতি ঠিক করতে। এরপর যেভাবে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। এখন পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের কোনো তুলনা চলে না। কারণ, দু-একটা বাদে প্রায় সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকেই পাকিস্তানের থেকে আমরা অনেক ভালো করেছি। আমাদের তুলনা হতে পারে ভারত, শ্রীলঙ্কা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোনো দেশের সঙ্গে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জগুলো কী? কোথায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার?
সায়মা হক: ২০৩০ সাল নাগাদ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এখন যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার সুফল সবার কাছে পৌঁছানোটাই বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য দূরীকরণে সাফল্য এলেও দেখা যাচ্ছে ধনী-গরিবের মধ্যে সম্পদবৈষম্য আগের চেয়ে বেড়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণে বর্তমানের যে গতি, সেটা ধরে রাখতে হবে, সম্ভব হলে তা আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির সুফল সব মানুষ যাতে সমানভাবে পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ দেশের যে উন্নতি হচ্ছে, তার ভাগ সবাইকে দিতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে হলে মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে শিল্পায়নের গতিও বাড়াতে হবে। মূল শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো যথেষ্ট নয়, এটি বাড়াতেও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সমাজের অর্ধেক অংশকে অর্থনৈতিকভাবে পেছনে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রথম আলো: অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার যে নীতি নিয়ে এখন কাজ করছে সেগুলো কি যথেষ্ট?
সায়মা হক: দীর্ঘমেয়াদি যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, সেগুলো যথেষ্ট মানসম্পন্ন। এখানে দেখার বিষয় হচ্ছে কোন বিষয়গুলোকে আমরা বেশি গুরুত্ব দেব। সরকারি খাতের বিনিয়োগ বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বেসরকারি খাতকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। যেকোনোভাবে টাকা খরচই যেন সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যাতে মূল লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বছর শেষে প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের কাজে জোর দিতে হবে। একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি ভালো ফল পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে আরও পুরস্কৃত করা যেতে পারে। একইভাবে কোনো প্রকল্প যদি ভালোভাবে কাজ না করে, তাহলে সেটা কেন ভালো করল না, সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে এর সুফল বেসরকারি খাতও পাবে।
প্রথম আলো: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও ধনী-গরিবের বৈষম্য আগের চেয়ে বাড়ছে। এটা কমিয়ে আনতে কী করা উচিত?
সায়মা হক: যাঁরা বেশি আয় করেন তাঁদের বেশি কর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চ আয়ের শ্রেণিতে পড়েন এমন অনেক লোক করের আওতার বাইরে আছে। তাঁদের করের আওতায় আনতে হবে। সীমিত আয়ের লোকদের করের আওতায় এনে খুব বেশি কর পাওয়া সম্ভব নয়। সমাজের নিচের দিকের বৈষম্য কমিয়ে আনতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন বড় দুর্বলতা হলো, বাজার চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। এ জন্য কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যাতে খুব বেশি না বাড়ে, সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম আলো: কর আদায় ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বেসরকারি খাতের অনেক অভিযোগ রয়েছে। এখানে সরকারের কী করার আছে?
সায়মা হক: বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কালক্ষেপণ। এটা কর আদায় ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি দেখা যায়। কর দেওয়ার বিষয়টিও বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য খুব সহজবোধ্য নয়। কর কর্মকর্তাদের কর আদায়ে যতটা দক্ষতা ও সততা থাকা দরকার, সেটারও ঘাটতি আছে। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করারও একটা প্রবণতা কর কর্মকর্তাদের রয়েছে। প্রতিটি আর্থিক লেনদেনকে যদি ব্যাংক হিসাব ও টিআইএনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে কর আদায় অনেকটা সহজ করা সম্ভব। কর বাড়ানোর বিষয়টি এমনভাবে করতে হবে, যাতে তা করদাতাদের জন্য বাড়তি বোঝা মনে না হয়।
প্রথম আলো: ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম বেড়েই চলেছে। এসব ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
সায়মা হক: ব্যাংকের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে সেবার মান বাড়ছে না। যাঁদের লেনদেনে সমস্যা আছে তাঁদের না ধরে ছোট ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের বেলায় নিয়মকানুনের কড়াকড়ি হচ্ছে। অনেক ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ব্যাংক খুলে ঋণ নেওয়া। এভাবে ব্যবসায়ীরা সরাসরি ব্যাংকিং খাতে যুক্ত হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যেখানে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো দরকার, সেখানে বাড়ছে না। সরকারকে অবশ্যই একটি যথাযথ আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে।