কেউ দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে, কেউ অন্যকে বা অন্য দেশের ওপর প্রভাব খাটাতে কিংবা আক্রমণ করতে অস্ত্র কেনে। আবার কেউবা প্রতিবেশীর সঙ্গে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে বা আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে অস্ত্রের মজুত গড়ে তোলে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতগুলোকে উপেক্ষা করে দেশের স্বাভাবিক সামর্থ্যের তুলনায় বেশি খরচ করে অস্ত্রের জন্য। আবার বিভিন্ন দেশের কলহলিপ্ত বা স্বাধীনতাকামী কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিগোষ্ঠীও প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করে। এসব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দুভাবেই অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের কেনাবেচা দিন দিন বাড়ছে।
২০১৯ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ২৫টি কোম্পানি ৩৬১ বিলিয়ন বা ৩৬ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সেবা বিক্রি করেছে, যা বাংলাদেশের ৩০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমান। ২০১৯ সালের অস্ত্র বিক্রি ২০১৮ সালের চেয়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। সম্প্রতি সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) এ তথ্য প্রকাশ করেছে। সিপ্রির আর্মস ইন্ডাস্ট্রি ডেটাবেইস অনুযায়ী ভৌগোলিকভাবে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্ত্র ও সামরিক সেবা বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য
বৈশ্বিক অস্ত্রের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। ২০১৯ সালে শীর্ষ পাঁচ অস্ত্র কোম্পানিই ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কোম্পানিগুলো হচ্ছে লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরোপ গ্রুম্ম্যান, রেথিওন ও জেনারেল ডায়নামিকস। এই পাঁচ কোম্পানি গত বছর অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে ১৬৬ বিলিয়ন বা ১৬ হাজার ৬০০ ডলার। এই অর্থ শীর্ষ ২৫ কোম্পানির মোট অস্ত্র বিক্রির প্রায় ৪৬ শতাংশ। শীর্ষ ২৫ কোম্পানির মধ্যে ১২টিই যুক্তরাষ্ট্রের। শীর্ষ পঁচিশের মোট অস্ত্র বিক্রির ৬১ শতাংশই হলো যুক্তরাষ্ট্রের এই ১২ কোম্পানির।
দুই নবাগতের উত্থান
এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের একটি কোম্পানি শীর্ষ পঁচিশে ঢুকেছে। সেটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এজ (ইডিজিই)। এটি আছে ২২তম স্থানে। ২৫টি ছোট ছোট কোম্পানির একীভূত হওয়ার সুবাদে গত বছরই যাত্রাও শুরু হয় এজের।
শীর্ষ পঁচিশে আরেক নবাগত কোম্পানি হলো এলথ্রিহ্যারিস টেকনোলজিস। সেটি দশম স্থানে রয়েছে। দুটি মার্কিন কোম্পানি হ্যারিস করপোরেশন ও এলথ্রি একীভূত হয়ে এ কোম্পানি গঠন করে।
চীনারা এগোচ্ছে, রুশরা পেছাচ্ছে
সিপ্রির এ তালিকায় চীনা কোম্পানি চারটি। তাদের বিক্রি বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে তিনটিই রয়েছে টপ টেনে। কোম্পানিগুলো হচ্ছে অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়না (অ্যাভিক, ষষ্ঠ), চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি, অষ্টম) এবং চায়না নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপ করপোরেশন (নোরিনকো, নবম)। চীনের অন্য কোম্পানির নাম চায়না সাউথ ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপ করপোরেশন (সিএসজিসি, ২৪তম)।
সিপ্রির জ্যেষ্ঠ গবেষক ন্যান তিয়ান বলেন, চীন পিপলস লিবারেশন আর্মির জন্য সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ফলে সেই দেশের অস্ত্র কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে।
প্রথম পঁচিশে বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তি রাশিয়ার কোম্পানি মাত্র দুটি—আলম্যাজ-অ্যানটে ও ইউনাইটেড শিপ বিল্ডিং। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে কোম্পানি দুটির বিক্রি কমেছে ৬৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আরেক রুশ কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ারক্র্যাফটের বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১৩০ কোটি ডলার কমেছে। ফলে কোম্পানিটি শীর্ষ ২৫ থেকে ছিটকে পড়ে।
সিপ্রির গবেষক আলেক্সান্ডার কুইমোভা বলেন, অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং নৌবহর আধুনিকায়নে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ কমে যাওয়ায় ইউনাইটেড শিপ বিল্ডিং ২০১৯ সালে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
শীর্ষ পঁচিশের বেচাবিক্রির রকমফের
দেশ বিবেচনায় শীর্ষ ২৫ কোম্পানির সম্মিলিত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির মধ্যে চীনের হিস্যা হলো ১৬ শতাংশ। পশ্চিম ইউরোপের ছয়টি দেশের অংশ হচ্ছে ১৮ শতাংশ। রুশ কোম্পানি দুটোর হিস্যা ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ২৫ কোম্পানির মধ্যে ১৯টির বিক্রি বেড়েছে। এর মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ ৫১০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন, যা টপ ২৫ কোম্পানির মোট বিক্রির ১১ শতাংশ।