বস্তা সেলাইয়ের কারিগর থেকে সফল উদ্যোক্তা যশোরের আবুল কালাম
ফেলে দেওয়া নোংরা-ময়লা কাগজের কার্টন সংগ্রহ করে সেখান থেকে কাগজের কোন তৈরি করেন যশোরের আবুল কালাম। এই কোনে পেঁচিয়েই দেশে-বিদেশে যায় সোনালি আঁশ পাটের সুতা।
কোনো কিছুই একেবারে ফেলনা নয়। যেমন ফেলনা নয় ফেলে দেওয়া নোংরা-ময়লা কাগজের কার্টনও। এসব ময়লা কাগজের কার্টন থেকে মণ্ড তৈরি করে পরে সেখান থেকে কাগজের কোন বানিয়ে সফল হয়েছেন এক উদ্যোক্তা। যদিও স্থানীয়ভাবে এই েকানকে ববিন বলা হয়। আর এই কোনে পেঁচিয়েই দেশে-বিদেশে যায় সোনালি আঁশ পাটের সুতা।
যশোরের আবুল কালাম নামের এক উদ্যোক্তা ফেলে দেওয়া কার্টন থেকে পাট সুতার কোন তৈরি করেন। সরাসরি রপ্তানিকারক না হলেও আবুল কালামের কোন প্রচ্ছন্নভাবে রপ্তানি হয়। ফেলনা কার্টন পুনর্ব্যবহার করে তা থেকে পণ্য তৈরির মাধ্যমে উদাহরণ স্থাপন করেছেন স্বল্প িশক্ষিত আবুল কালাম।
খুলনা-যশোর অঞ্চলে একমাত্র কালাম প্যাকেজিং নামের প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের কোন তৈরি করে। যশোরের ঝুমঝুমপুরের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নগরীতে ছোট্ট একটি কারখানা রয়েছে তার। এ কারখানায় প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোন তৈরি হয়। প্রায় ৫০ জন কর্মী সেখানে কাজ করেন।
খুলনার ফুলতলার সুপার জুট মিল ও যশোরের অভয়নগরের আকিজ জুট মিলে কোন বিক্রি করেন আবুল কালাম। প্রতিটি কোনের দাম গড়ে ৩ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কোনে মুনাফা ৩০ থেকে ৫০ পয়সা। সুপার জুট মিল ও আকিজ জুট মিলের পাটের সুতা রপ্তানি হয় ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তাই এসব সুতার গায়ে জড়িয়ে আবুল কালামের কোনও ওই সব দেশে প্রচ্ছন্নভাবে রপ্তানি হয়।
২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের যশোর বিসিক শাখা থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেন আবুল কালাম আজাদ। অবশ্য তার আগে ২০০৮ সাল থেকে বিসিকে স্থাপিত কারখানায় মোটা কাগজের কার্টন বানান তিনি।
সম্প্রতি কালাম প্যাকেজিংয়ে দেখা যায়, তিনতলা কারখানার নিচতলায় মণ্ড তৈরি হচ্ছে। সেখানে একদিকে পুরোনো কার্টনের কাগজ ছিঁড়ে মণ্ড তৈরির যন্ত্রের গোলাকৃতির বিশাল পাত্রের ফুটন্ত পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে কয়েক ধাপ পেরিয়ে তরল কার্টনের মণ্ড থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোটা কাগজের শিট বেরিয়ে আসে। এরপর দোতলায় তা টুকরো করে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন বানানো হয়। তিনতলার ছাদে তা শুকানো হয়। পরে তা ট্রাকে করে বিভিন্ন পাটকলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কালাম প্যাকেজিংয়ের কারখানায় প্রতিদিন দুই টন ফেলে দেওয়া কার্টন ব্যবহার করা হয়। যশোরের বিভিন্ন এলাকার ফড়িয়ারা এই কারখানায় কার্টন সরবরাহ করে। প্রতি কেজি ১০ টাকায় কেনেন আবুল কালাম। আবুল কালাম বলেন, ‘অভাবের কারণে একসময় ঠিকমতো খেতে পারতাম না। পড়াশোনা নেই বললেই চলে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আজ এই পর্যায়ে এসেছি।’ তিনি জানান, ভবিষ্যতে আরও ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। পরিবেশবান্ধব ব্যবসা করবেন। এ জন্য বিসিকে নতুন প্লট নিতে চান।
আবুল কালামের উঠে আসার গল্প
মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন ৫৩ বছর বয়সী আবুল কালাম। অভাবের কারণে পড়াশোনা আর বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তাঁর বাড়ি যশোর শহরের পাশেই নালিয়া গ্রামে।
জীবিকার তাগিদে আশির দশকের শুরুতে যশোর শহরের বস্তাপট্টিতে এক কারখানায় বস্তা সেলাইয়ের কাজে লেগে যান। তখন বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। বেতন মাসে ১৫ টাকা। থাকা-খাওয়া বিনা মূল্যে। এভাবে দুই বছরের মধ্যেই বেতন আড়াই শ টাকা হয়। একবার এক দিনের ছুটি নিয়ে নানাবাড়িতে বেড়াতে যান। কিন্তু পাঁচ দিন কাটিয়ে কারখানায় ফিরলে তাঁকে চাকরি থেকে বিদায় করে
দেওয়া হয়।
কিশোর বয়সেই বেকার হয়ে যান। তাতে এক বেলা খেতে পারেন, আরেক বেলা খেতে পারেন না। কিছুদিন পর তাঁর মা দুঃসময়ে সঞ্চয় থেকে ১৩৫ টাকা তুলে দেন তাঁর হাতে। সেই টাকা নিয়ে তিনি যশোরের বস্তাপট্টিতে ফিরে আসেন। এবার তিনি ফেলে দেওয়া ভাঙারি কাগজ, কার্টনের ফড়িয়ার কাজে নামেন।
ভালোই লাভ হতে শুরু করে। একসময় ১৯৯৫ সালের দিকে বস্তাপট্টির চৌরাস্তায় ঘর ভাড়া নিলেন। এবার তিনি শুধু ফেলে দেওয়া কার্টন সংগ্রহ করে জিকিউ বলপেন কোম্পানিতে সরবরাহ করতে থাকেন। সুখের মুখ দেখতে থাকেন। এরপর একসময় চিন্তা করলেন ফড়িয়ার মতো কার্টন সরবরাহ না করে এসব ফেলে দেওয়া সামগ্রী দিয়ে কিছু একটা বানানো যায় কি না, তা দেখবেন।
এরপর ২০০৯ সালে যশোর বিসিকে বর্তমান প্লট ভাড়া নিয়ে প্যাকেজিংয়ের শিট বানাতে শুরু করেন। তার মাধ্যমে হয়ে গেলেন ফড়িয়া থেকে উৎপাদক। পাঁচ বছর আগে বিসিকের প্লটটি তিনি কিনে নেন। সেখানে ২০২১ সালে উৎপাদন শুরু করেন ব্যতিক্রমী পণ্য কোন।
বস্তা সেলাইয়ের কাজ থেকে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। এরপর ফেলে দেওয়া কাগজ, কার্টন, বিভিন্ন পণ্যের কাগজের মোড়ক সংগ্রহ করে ফড়িয়ার কাজ করতেন। এখন তিনি সফল উদ্যোক্তা। এভাবে জীবনের নানা ধাপ পেরিয়ে সফলতার দেখা পান আবুল কালাম।