যখন দরকার হয় তখনই মেলে চিকিৎসা পরামর্শ

আনোয়ার হোসেন, সিইও, ডকটাইম
সংগৃহীত

দেশের সর্বত্র এখনো জনসংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার বেসরকারি হাসপাতালে বিকেল–সন্ধ্যার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেভাবে পাওয়া যায় না। এতে বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের ভোগান্তি কমানোর বিষয়ে কাজ করছেন প্রযুক্তি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ডকটাইম। অ্যাপভিত্তিক এই উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রযুক্তিনির্ভর অন ডিমান্ড বা চাহিদাভিত্তিক স্মার্ট চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে।

আনোয়ার হোসেন জানান, এই সেবা অনেকটা রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মতো। এখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন গ্রাহকেরা। পাশাপাশি একই অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসে ডায়াগনস্টিক সেবা ও ওষুধ কিনতে পারেন।

অফিস কক্ষে কাজ করছেন ডকটাইমের কর্মীরা

আলাপকালে মুন্সিগঞ্জের ছেলে আনোয়ার হোসেন জানান, সাত বছর বয়সে একটি ছোট দুর্ঘটনায় তাঁর হাত বাঁকা হয়ে যায়। তখন স্থানীয় পর্যায়ে ভালো চিকিৎসক ছিলেন না। তাই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুসারেই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আনোয়ারের সেই হাত আর স্বাভাবিক হয়নি। তিনি এখন মনে করেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ পেলে তাঁর এই ভোগান্তি হতো না। নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবেই ডকটাইমের মতো উদ্যোগ নেন আনোয়ার হোসেন।

আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সব মানুষ যেন কম খরচে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক পরামর্শ পান, সেই লক্ষ্যে আমি কাজ করছি।’

আনোয়ার হোসেন ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর বৃত্তি নিয়ে কম্পিউটিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিষয়ে পড়তে ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যে যান। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ২০০৭ সালে সেখানেই একটি প্রযুক্তি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর প্রায় দেড় দশকে যুক্তরাজ্যে ১০টির মতো প্রযুক্তি কোম্পানিতে কাজ করেন আনোয়ার। কাজের পাশাপাশি দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কিছু করার জন্যও প্রস্তুতি নেন তিনি।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেশ দুর্বলতা রয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত—সবখানেই কমবেশি চিকিৎসকের স্বল্পতা রয়েছে। আমার নিজেরও উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল। এ জন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চাই আমি।’

সেই চিন্তা থেকে ২০১৯ সালে চারজন বাংলাদেশিকে সঙ্গে নিয়ে আনোয়ার প্রতিষ্ঠা করেন ডকটাইম নামের অ্যাপভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে এটির মালিকানায় যুক্ত আছেন ছয়জন। প্রাথমিকভাবে এ জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন তাঁরা। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটিতে ছয়জন কর্মী কাজ করতেন। তবে বর্তমানে ৭০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। আর স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর সরকারের আইডিয়া প্রকল্প থেকে ডকটাইম পেয়েছে বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্র্যান্ট বা বিগ অ্যাওয়ার্ড।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ডকটাইম হচ্ছে অ্যাপভিত্তিক একটি স্মার্ট হেলথ কেয়ার বা স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম। এই অ্যাপের মাধ্যমে দিনে–রাতে যেকোনো সময় মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক পরামর্শ নিতে পারবেন গ্রাহকেরা। এ ছাড়া ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা নেওয়া যায়। তিনি জানান, বর্তমানে ডকটাইম প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলে নিবন্ধিত ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন।

চিকিৎসকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছেন রোগী
সংগৃহীত

সাধারণ কোনো সমস্যা নিয়ে করণীয় জানতে চাইলে ডকটাইম অ্যাপে অত্যন্ত স্বল্প খরচে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন গ্রাহকেরা। আবার নির্দিষ্ট ফির মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন যে কেউ। কথা বলা শেষ হলে অ্যাপের মাধ্যমেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেওয়া হয়।

ডকটাইমে ওষুধের হোম ডেলিভারিরও ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকেরা চাইলে ঘরে বসে ডকটাইম থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে পারবেন। চিকিৎসক যদি কোনো ডায়াগনস্টিক টেস্ট বা পরীক্ষার পরামর্শ দেন, তাহলে সেটাও অ্যাপের মাধ্যমে করা যাবে। অর্থাৎ অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার বা ফরমাশ দিলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মীরা বাসায় এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে নেবেন এবং রিপোর্ট তৈরি হলে আবার তা ঘরে এসে পৌঁছে দেবেন। এ ছাড়া ডকটাইম রোগীদের ই–হেলথ রেকর্ড সংরক্ষণও করে থাকে।

জানা গেছে, বর্তমানে ডকটাইম প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার নিবন্ধিত গ্রাহক রয়েছেন। অন্তত একবার ডকটাইমের সেবা নিয়েছেন, এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার। এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি ভিডিও কনসালটেশন সম্পন্ন করেছে ডকটাইম। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ নারী ও শিশু এবং ৫৮ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ ব্যক্তিকে সেবা দেয় ডকটাইম অ্যাপ।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য দেশের সব মানুষের ই–হেলথ রেকর্ড তৈরি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আগামী বছরের মধ্যে অন্তত এক কোটি পরিবারের কাছে সেবা পৌঁছাতে চাই আমরা। এ ছাড়া বি–টু–বি ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’