অনলাইন মেলাতেও ভাগ্য ফিরল না ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের
চামড়াজাত পণ্যের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বছরজুড়ে অপেক্ষা করেন জাতীয় এসএমই পণ্য মেলার। এ মেলা থেকে তিনি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারেন। পান ভবিষ্যৎ কাজের ফরমাশও। বাংলাদেশ এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলা তাঁর বার্ষিক বিক্রিতে একটি ভালো ভূমিকা পালন করে।
করোনার প্রাদুর্ভাবে এমনিতেও ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে, তার ওপর বেশ কিছু ক্রয়াদেশ হারিয়েছেন। আশা ছিল এসএমই মেলা আয়োজিত হলে কিছুটা ক্ষতি পোষাবেন। এ আশা নিয়েই তিনি গত ৩ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনলাইনে আয়োজিত এসএমই মেলায় অংশ নেন। মোস্তাফিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনলাইনে এ মেলায় সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকার ব্যবসাও করতে পারিনি।’
একই অবস্থা কৃষিজাত পণ্যের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মঞ্জুর আলমেরও। স্বাভাবিক সময়ে মেলায় দিনে প্রায় ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয় তাঁর। অনলাইন মেলাজুড়ে তাঁর বিক্রি হয়েছে মাত্র ছয় হাজার টাকা। এ বিক্রিতে স্বভাবতই হতাশ তিনি।
করোনায় ব্যবসা কমে যাওয়ায় অন্য সব খাতের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসএমই খাতও। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এ ক্ষতির কথা বিবেচনা করে করোনার মধ্যে ব্যবসা চালু করতে এসএমই ফাউন্ডেশন অনলাইনে আয়োজন করে এসএমই পণ্য মেলার। সারা দেশের ৩৮ জেলা থেকে ৩২৮ উদ্যোক্তা এ মেলায় অংশ নেন।
অনলাইনে আয়োজিত প্রথম এসএমই পণ্য মেলা কেমন গেল, এ বিষয়ে অন্তত ২০ জন অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলায় খুব কম সাড়া পেয়েছেন তাঁরা। বিক্রির পরিমাণও খুব কম। এ ছাড়া গ্রামপর্যায়ের উদ্যোক্তারা জানান, ইন্টারনেট–সুবিধা কম থাকায় অংশ নিতে পারেননি তাঁরা।
অনলাইনের এ মেলা যে খুব সাড়া ফেলতে পারেনি, তা এসএমই ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য থেকেও জানা যায়। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এ মেলার ওয়েবসাইট ভিজিট করেছেন মাত্র পাঁচ হাজার মানুষ। একই সময়ে ওয়েবসাইটটি ভিউ হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার বার। তবে আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে অনলাইন মেলাটিতে কেমন ব্যবসা হলো, তা সংখ্যাগত তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে না এসএমই ফাউন্ডেশন। কারণ, মেলাটিতে কী পরিমাণ পণ্য বিক্রি হয়েছে বা কত টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে, এমন কোনো তথ্য রাখেনি তারা।
ওয়েবসাইটটিই এমনভাবে তৈরি করা হয়নি যে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। আমরা শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে চেয়েছি।
সাধারণত এসএমই ফাউন্ডেশন কোনো মেলা আয়োজন করলে তার আর্থিক লেনদেনের তথ্য তাদের কাছে থাকে। যেমন ২০২০ সালের ১৩ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিনাজপুর আঞ্চলিক এসএমই পণ্য মেলায় পণ্য বিক্রি হয়েছে ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকার এবং সেই মেলা থেকে পরবর্তী কাজের ফরমাশ পাওয়া গেছে ৩৪ লাখ ৭১ হাজার টাকার। আবার ওই বছরই ৪ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত আয়োজিত জাতীয় এসএমই পণ্য মেলায় বিক্রি হয়েছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকার পণ্য আর ফরমাশ এসেছে ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার।
অনলাইন এসএমই পণ্য মেলার তথ্য রাখা হয়নি কেন, এ প্রশ্নের জবাবে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর জানান, ‘ওয়েবসাইটটিই এমনভাবে তৈরি করা হয়নি যে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। আমরা শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে চেয়েছি। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের ম্যান্ডেটের মধ্যে কেনাবেচার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়।’
বাংলাদেশে এমনিতেও অনলাইনে পণ্য বিক্রি খুব জনপ্রিয় নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনগণের মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ই-কমার্সে কেনাকাটা করেন। করোনা পরিস্থিতিতেও ব্যাপক বিধিনিষেধ ও প্রচারণা সত্ত্বেও এ বছর ঈদুল আজহায় মোট পশুর মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। অনলাইন পণ্য মেলা থেকেও যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা খুব বেশি বিক্রি করতে পারবে না, তা প্রত্যাশিতই ছিল। তারপরও এই এসএমই পণ্য মেলা সাড়া না ফেলতে পারার কারণ হিসেবে প্রচারণার ঘাটতিকে চিহ্নিত করে উদ্যোক্তা ও আয়োজক উভয় পক্ষই।
এসএমই ফাউন্ডেশনের জেনারেল বডি মেম্বার উদ্যোক্তা গাজী তৌহিদুর রহমান বলেন, শুধু যে প্রচারণার অভাব ছিল, তা–ই নয়; এসএমই ফাউন্ডেশন তাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতেই মেলা করেছে। অনলাইনে মেলা আয়োজনের কোনো গবেষণা তাদের ছিল না।
বিআইডিএসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিক্রি ৬৬ শতাংশ কমে যায়। ২০২১ সালে ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) এক জরিপের ফল অনুযায়ী ৬১ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা মনে করেন, ২০২১ সালেও তাঁদের বিক্রি কমবে।
সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিক্রি ৬৬ শতাংশ কমে যায়। ২০২১ সালে ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) এক জরিপের ফল অনুযায়ী ৬১ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা মনে করেন, ২০২১ সালেও তাঁদের বিক্রি কমবে। এ রকম অবস্থায় অনলাইন মেলা আয়োজন জরুরি ছিল বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পরিচালক মো. রাশেদুল করিম। তিনি বলেন, নতুন উদ্যোক্তা ও নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে এসএমই পণ্য মেলার প্ল্যাটফর্মটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথম আয়োজন খুব সফল না হলেও এ আয়োজন অন্তত নতুন একটা ধারা তৈরি করল, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খুব প্রয়োজন ছিল।