উৎপাদন খরচ ৮৮, বিক্রি ৪৮ টাকা

দেশের সরকারি চিনিকলগুলোতে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদন করতে খরচ পড়ে প্রায় ৮৮ টাকা। সেই চিনি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪৮ টাকায়। ফলে এক কেজি চিনিতে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) কমপক্ষে ৪০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
সরকারি চিনিকলে চিনির উৎপাদন খরচের এই চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষায়। কমিশনের সদস্য আবদুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে সংস্থার উপপ্রধান রকিবুল হাসান, সহকারী প্রধান মাহমুদুল হাসান ও গবেষণা কর্মকর্তা লোকমান হোসেন ‘বাংলাদেশের চিনি শিল্প’ শীর্ষক ওই সমীক্ষাটি করেন।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে যে পরিমাণ আখ উৎপাদিত হয়, তার অর্ধেকও চিনিকলগুলো পেলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু আখচাষিরা দাম কম হওয়ায় এবং বিক্রীত আখের দাম সময়মতো না পাওয়ায় গুড় উৎপাদকদের কাছে আখ বিক্রি করে দেন।
বিএসএফআইসির অধীনে বর্তমানে ১৫টি চিনিকল আছে। এগুলোর বার্ষিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার টন। অথচ তারা সদ্য সমাপ্ত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিনি উৎপাদন করেছে মাত্র ৫৮ হাজার টন। প্রতিবছরই তাদের চিনি উৎপাদন কমছে, বিপরীতে বাড়ছে লোকসান। গেল অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত তাদের সার্বিক লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪৬২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।
বছর বছর চিনিশিল্পের লোকসান বাড়তে থাকায় ক্ষিপ্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মে মাসে এক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, ধীরে ধীরে আখ চাষ উঠিয়ে দেওয়া হবে।
ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষায় চিনিকলগুলোকে লাভে আনতে পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হচ্ছে, পরিপক্বতা অনুযায়ী যথাসময়ে আখ ক্রয়, মান অনুযায়ী আখের দাম নির্ধারণ, উন্নত জাতের আখ চাষ এবং বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধন করা।
এসব সুপারিশের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে পারলেই চিনির কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ কমে যাবে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করছে।
দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, পরিপক্বতা অনুযায়ী আখ কেনা, চাষিদের ভালো মানের উপকরণ বিতরণ, ওজন মাপতে ডিজিটাল যন্ত্র আনা, চাষিদের সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেওয়া, আখ কেনার সঙ্গে সঙ্গেই চাষিদের দাম দেওয়া, চিনি প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা, আখের উপজাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যেখানে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধন করা হবে বলেও জানান বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান।
উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহৃত: বিএসএফআইসির অধীনে থাকা ১৫টি চিনিকলের তিনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে, নয়টি পাকিস্তান আমলে এবং তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। এসব কলের চিনি উৎপাদন প্রতিবছর কমছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই মিলগুলোতে ১ লাখ ২৮ হাজার টন চিনি উৎপাদিত হয়েছিল। পরের বছর তা কমে প্রায় ৭৭ হাজার টনে নামে। আর সদ্য সমাপ্ত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিনি উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে ৫৮ হাজার টনে নেমে এসেছে।
এদিকে বেসরকারি চিনি পরিশোধকারীদের উৎপাদন ক্ষমতা ৩১ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে সিটি গ্রুপই বছরে ১৫ লাখ টন চিনি উৎপাদন করতে পারে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, এক টন চিনি উৎপাদন করতে চিনি শিল্প করপোরেশনের খরচ হয় ৮৮ হাজার ৩০০ টাকা। এর ৪২ শতাংশ ব্যয় হয় আখের পেছনে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে চিনি উৎপাদনে প্রায় ৯৩ শতাংশ ব্যয় হয় অপরিশোধিত চিনির পেছনে। তাদের অন্যান্য খরচ খুব কম।
আখ উৎপাদন কমছে: ট্যারিফ কমিশনের সমীক্ষায় আখের উৎপাদন ও চিনি কলগুলোতে এর ব্যবহারের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০০০-০১ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৭ হাজার একর জমিতে ৬৭ লাখ ৪২ হাজার টন আখ উৎপাদিত হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে আখের আবাদ ও উৎপাদন কমতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৫ হাজার একর জমিতে আবাদ করে ৪৫ লাখ ৮ হাজার টন আখ উৎপাদিত হয়।
একরপ্রতি উৎপাদনও কমেছে। ২০০০-০১ অর্থবছরে একরপ্রতি উৎপাদন ছিল ১৬ দশমিক ১৭ টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে ১৫ দশমিক ৮২ টনে নেমে আসে। সরকারি চিনিকলগুলোতে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত মোট উৎপাদিত আখের গড় ব্যবহার ছিল ৩৩ শতাংশ।