একেকটি বাড়ি একেকটি কারখানা

সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাকশিল্প
সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাকশিল্প

দুটি সেলাই মেশিন নিয়ে নিজের ঘরেই ঝুট কাপড় থেকে পোশাক তৈরি শুরু করেছিলেন সৈয়দপুরের পৌর এলাকার মুন্সীপাড়ার গোলাম রাব্বানী। ওই দুটি মেশিনই তাঁর ভাগ্য খুলে দেয়। এখন তাঁর মেশিন আছে ২৫টি, মাসে আয় হয় ৩৫ হাজার টাকার মতো।
ঝুট কাপড় থেকে পোশাক তৈরি করে এভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের এমন আরও ৫০০ পরিবার।
সৈয়দপুর পৌর এলাকার মুন্সীপাড়া, নয়াটোলা, হাতিখানা, মিস্ত্রিপাড়া, নতুন বাবুপাড়া, পুরাতন বাবুপাড়া, গোলাহাট, রাবেয়া মোড়, ঘোড়াঘাট, বোতলাগাড়ী, বাঁশবাড়ী, নিয়ামতপুরমহ আটকে পড়া পাকিস্তানিদের একটি বড় অংশের ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা। এতে একেকটি বাড়ি পরিণত হয়েছে একেকটি পোশাক কারখানায়। প্রতি কারখানায় সর্বনিম্ন দুটি থেকে সর্বোচ্চ ৪৫টি পর্যন্ত মেশিন।
জানা গেছে, পাকিস্তান আমল থেকেই সৈয়দপুরে ঝুট কাপড় থেকে নানা ধরনের পোশাক তৈরি হয়ে আসছে। তবে ২০০২ সালে রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক গ্রুপ, সৈয়দপুর নামে পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন গড়ে ওঠার পর এর পরিধি অনেক বেড়ে যায়।
এখানকার কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে ট্রাউজার, শর্টস (হাফ প্যান্ট), জ্যাকেট, টি-শার্ট, জিনসের প্যান্টসহ নানা ধরনের পোশাক। স্থানীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি এসব পোশাক রপ্তানি হচ্ছে ভারত, ভুটান ও নেপালে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব কারখানাকে সরকার যদি নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে একটি পল্লি করে দেয়, তাহলে এ শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে এবং রপ্তানি আরও বাড়বে।
এই শিল্পে অর্থায়ন করতে এবং মালিক ও কারিগরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে এসেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি ২০১১-১২ অর্থবছরে এনসিসি ব্যাংকের মাধ্যমে ৯ শতাংশ সুদে ব্যবসায়ীদের জন্য দেড় কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করেছে।
ঝুট থেকে পোশাক
সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীরা পোশাক তৈরি করতে ঢাকার মিরপুর, কালিগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানের পোশাক কারখানাগুলো থেকে ঝুট কাপড় কিনে আনেন। পাশাপাশি সুতা, বোতাম, ইলাস্টিক, প্যান্টের পকেট বানানোর স্টিকার, পুরোনো সেলাই মেশিনও সংগ্রহ করেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঝুট কাপড় ও উপকরণসমূহ কেনা হয় কেজি হিসেবে। এর মধ্যে প্রতি কেজি ব্লেজারের ঝুট ৫০ থেকে ১৫০, জ্যাকেট তৈরির ঝুট ১০০ থেকে ১৫০, গ্যাবার্ডিন প্যান্টের ঝুট ৮০ থেকে ১৫০, জিনসের ঝুট ৭০ থেকে ১৫০, জিপার ৮০ থেকে ১০০, সুতা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে কেনা হয়।
রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক গ্রুপের সভাপতি আকতার হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব ঝুট চার-পাঁচ হাত ঘুরে আমাদের কাছে আসে। সরাসরি গার্মেন্টস থেকে কিনতে পারলে আরও কমে কিনতে পারতাম।’
ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরও বাচ্চাদের জ্যাকেট তৈরি করা যেত ১০০ টাকায়। এখন খরচ হয় ১৫০ টাকা। বড়দের জ্যাকেট তৈরিতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ পড়ে।
ভারত ও ভুটানে রপ্তানি
ভারতে গত রমজানে ১৪ হাজার ৫০০ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান। আগের মাসে দুই হাজার ৯৫০ ডলার মূল্যের ট্রাউজার, শর্টস ও টি-শার্ট ভুটানে রপ্তানি করেন তিনি।
তবে সৈয়দপুরের ৫০০ ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র ছয়টির রপ্তানির লাইসেন্স আছে। এসব লাইসেন্স ব্যবহার করে বছরে চার লাখ ডলারের এবং ঢাকা ও রংপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ীর লাইসেন্সে আরও দুই লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।
মতিয়ার রহমান বলেন, ‘ভারত থেকে ৫০ হাজার পিস পোশাক আমদানির ঋণপত্র (এলসি) পাঠাল। আমার কারখানায় ১২ হাজার পোশাক হয়, আমি আরও পাঁচটা কারখানা থেকে পোশাক নিয়ে ৫০ হাজার পোশাক পাঠিয়ে দিলাম। আর পোশাক সরবরাহকারী অন্য কারখানাগুলোকে পোশাকের পরিমাণ অনুযায়ী টাকা দেওয়া হলো।’
বেশির ভাগ রপ্তানির কার্যাদেশ আসে ভারতের শিলিগুড়ি থেকে। আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় থেকেও কার্যাদেশ আসে।
তবে সৈয়দপুরের ব্যবসায়ীরা অনেক সময়ই রপ্তানির নামে কিছু কারসাজি করেন বলেও শোনা যায়। যেমন, ১১ লাখ রুপির পোশাক রপ্তানির এলসি এলেও রপ্তানি হয় ১৫ লাখ রুপির।
মজুরিও কম নয়
বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একটি ট্রাউজার তৈরির মজুরি ২০ টাকা। দিনে একজন কারিগর ১০ থেকে ১২টি ট্রাউজার তৈরি করতে পারেন। সেই হিসাবে তাঁর মজুরি অন্তত ২০০ থেকে ২৪০ টাকা পড়ে, আর মাসে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা।
আবার একজন কারিগর বড় জ্যাকেট তৈরি করে মজুরি পান ১৫০ টাকা। দিনে বানাতে পারেন চারটি। অর্থাৎ তাঁর প্রতিদিনের মজুরি ৬০০ টাকা, মাসিক আয় ১৮ হাজার টাকার মতো।

ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাক
ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাক

সৈয়দপুরে ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাকশিল্প
৫০০ পরিবার ঝুট কাপড়ের পোশাক তৈরি করে ইতিমধ্যে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে
৬ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় বছরে; যা নেয় ভারত, ভুটান ও নেপাল। আর স্থানীয় বাজারে নিয়মিত সরবরাহ হয়
১.৫ কোটি টাকার ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন
৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত একজন শ্রমিক আয় করতে পারেন কাজভেদে
 তৈরি হয় ট্রাউজার, শর্টস (হাফপ্যান্ট), জ্যাকেট, টি-শার্ট, জিনসের প্যান্টসহ নানা ধরনের পোশাক
 ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কারখানাগুলোর জন্য সরকার একটি পোশাকপল্লি তৈরি করে দিলে এ শিল্পের আরও বিকাশ ঘটবে ও রপ্তানি বাড়বে