নভেম্বর মাসের শেষ নাগাদ করোনাভাইরাসের অমিক্রন ধরনের কথা যখন শোনা গেল, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, আরেকটি ভাইরাস–ঝড় আসন্ন। আর সেই ঝড়ে অর্থনীতি আবারও সেই ২০২০ সালের অবস্থায় ফিরে যাবে।
অর্থনীতিতে সেই ঝড়ের লক্ষণ কিছুটা দেখাও যাচ্ছিল—অমিক্রনের আগমনের খবরে বৈশ্বিক শেয়ার সূচকের গড়ে ৫ শতাংশ পতন হয়। ডলার ও ইয়েনের মতো নিরাপদ মুদ্রা আরও শক্তিশালী হয় আর জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার পর্যন্ত কমে যায়।
কিন্তু স্বস্তির খবর হলো, অর্থনীতির বিশেষ ক্ষতি হয়নি। অন্তত যতটা ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে ক্ষতি ততটা হয়নি। ১৮ জানুয়ারি জ্বালানি তেলের দাম সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৮ ডলারে উঠে যায়। এ মুহূর্তে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়, অনেকটা নভেম্বরের শেষ সময়র মতো, কিন্তু তা মূলত বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে—কোভিড-১৯-এর কারণে নয়।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ইউরোপের বিমান পরিবহন কোম্পানি ও হোটেলের শেয়ারমূল্য সূচক তৈরি করেছে। এতে দেখা গেছে, এসব ব্যবসার ভবিষ্যৎ বেশ ভালো। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত সত্ত্বেও মানুষ এখন তেমন পাত্তা দিচ্ছে না।
সাধারণ কিছু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছেন ধনী দেশগুলোর জোট ওইসিডির বিশ্লেষক নিকোলাস উলেসজকো। তিনি মূলত ৪৬টি মধ্যম ও উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মানুষের গুগল সার্চের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন—গৃহায়ণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এসব বিষয়ের তথ্য নিয়ে এ বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। এ সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এই ৪৬টি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার এখন প্রাক্-মহামারি যুগের চেয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ছোট। নভেম্বর মাসের চেয়ে তা কিছুটা কম, তবে এক বছর আগের, অর্থাৎ ২০২১ সালের জানুয়ারির তুলনায় তা বেশ ভালো, তখন জিডিপি প্রাক্–মহামারি সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কম ছিল।
এবার অমিক্রনের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির অতটা ক্ষতি কেন হলো না, কয়েকটি বিষয়ে নজর দিলেই তা পরিষ্কার হবে। বিষয়টি হলো, এবারের তৃতীয় ঢেউয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মৃত্যুর হার অত বেশি নয়। চীন ছাড়া খুব কমসংখ্যক দেশই মনে করছে, মানুষের চলাফেরায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) চীনের এই শূন্য কোভিড নীতির সমালোচনা করেছে।
ধনী দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র নেদারল্যান্ডস প্রকৃত অর্থে লকডাউন আরোপ করেছে, যদিও ১৪ জানুয়ারি তারা আংশিকভাবে তা তুলে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা অক্টোবরের পর সেই অর্থে বাড়েনি। ইকোনমিস্টের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ব্রিটেন জানিয়েছে, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার সনদ থাকলে ভ্রমণকারীদের করোনা পরীক্ষা করানোরও প্রয়োজন নেই। থাইল্যান্ডও পর্যটক টানতে বিধিনিষেধ শিথিল করেছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষ এখন ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। বিষয়টি এখন অনেকটা এরকম হয়ে গেছে: ২০২০— সংক্রমণ নিয়ে প্রচণ্ড ভীতি, ২০২১—অল্প ভীতি, ২০২২— স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। মানুষের এই অদম্য মনোভাবের কল্যাণে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুতই স্বাভাবিক হবে, বিশ্লেষকেরা এমনটাই ভাবছেন। কিছু মানুষের প্রাণ যাবে, কিন্তু মানুষ সেই ক্ষতি মেনে নিতে অনেকটাই প্রস্তুত।
গোল্ডম্যান স্যাকস যে লকডাউন সূচক প্রণয়ন করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ডেলটা ধরনের চেয়ে এবার অমিক্রন ধরনের প্রভাবে অনেক দেশে দ্বিগুণ-তিন গুণ সংক্রমণ হলেও বিধিনিষেধের মাত্রা বাড়ানো হয়নি। গত বছর জুলাই-আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে দৈনিক সংক্রমণ ছিল ১০০-এর অনেক কম। এখন সেখানে দিনে দুই হাজারের বেশি সংক্রমণ হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ শহরের ব্যায়ামাগার ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়নি।
তবে অমিক্রনে এত বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার কারণে অর্থনীতিতে ভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর জরিপ অনুসারে, জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ আক্রান্ত মানুষের সেবা করতে গিয়ে বা নিজেরা আক্রান্ত হয়ে কাজের বাইরে ছিলেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের অনেক দেশেই শ্রমিকসংকট সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দোকানমালিক কর্মীর অভাবে পুরো সময় দোকান চালাতে পারছেন না। আরেক বিনিয়োগ ব্যাংক জে পি মরগ্যানের হিসাব অনুসারে, এই শ্রমিকসংকটের কারণে জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ জিডিপি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এদিকে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শহরে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ধারণা করছে, এই ঢেউ মার্চ নাগাদ থেমে যাবে।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপেও দেখা গেছে, কোম্পানিগুলোর আত্মবিশ্বাসে তেমন চিড় ধরেনি। সব মিলিয়ে তাই বিশ্লেষকেরা আশা করছেন, অমিক্রনের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির বিশেষ ক্ষতি হবে না।