চালের বিপণন এখনো প্লাস্টিকের বস্তায়

প্লাস্টিকের বস্তায় চাল। ছবিটি কারওয়ান বাজার থেকে গতকাল বিকেলে তোলা
প্লাস্টিকের বস্তায় চাল। ছবিটি কারওয়ান বাজার থেকে গতকাল বিকেলে তোলা

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে ধান ও চাল বিপণন শুধুই পাটের বস্তায় করা বাধ্যতামূলক করেছিল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশ ছিল, এই দুটি পণ্যে কোনো প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে না।
কিন্তু সরকারের এই নির্দেশ মানছেন না চালকলমালিকেরা। চাল এখনো প্লাস্টিকের বস্তায় বিপণন হচ্ছে।
আবার খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, চালকল থেকে যে বস্তায় চাল পাবেন, সেই বস্তাতেই তাঁরা বিক্রি করবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু করার নেই। আর চালকলমালিকেরা বলছেন, তাঁরাও পাটের বস্তা ব্যবহার করতে চান। এ ক্ষেত্রে সরকারকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বস্তার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দাম কমাতেও ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে চালের দাম বেড়ে যাবে। প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।
সরকারের সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছিলেন অনেক পাটকলমালিক। কিন্তু এখনো প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বিপণন হওয়ায় হতাশ তাঁরা।
২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সরকারিভাবে ধান, চাল ও গম বাজারজাত করার ক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তরই শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করে। কিন্তু বেসরকারি চালকলমালিকেরা আইনটি উপেক্ষাই করে আসছেন।
সে কারণেই ধান ও চালের মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। তাতে বেসরকারি চালকল, চাতালমিল ও চালের দোকানদারদের কাছে থাকা সব প্লাস্টিকের বস্তার ব্যবহার ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ ছিল।
রাজধানীতে পাইকারি চালের বড় আড়ত বাবুবাজারে একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানের চালকল থেকে তাঁদের কাছে চাল পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে চাল প্লাস্টিকের মোড়কে, না পাটের বস্তায় পাঠানো হলো, সে বিষয়টি তাঁদের হাতে নেই। তাঁরা যে বস্তায় পাবেন, সেই বস্তাতেই চাল বিক্রি করবেন। একই রকম মন্তব্য কারওয়ান বাজারের চালের আড়তের ব্যবসায়ীদেরও।
জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার বড় অটোরাইস মিল রশিদ এগ্রো-প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদ বলেন, ‘সরকার যেহেতু নির্দেশ দিয়েছে, আমরাও চটের (পাটের) বস্তায় চাল দেব। কিন্তু রাতারাতি এটা করা যাবে না। প্লাস্টিকের বস্তা আমরা যেমন সহজে পাই, চটের বস্তা সহজে পাই না। দামও বেশি। সরকারকেও বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।’
পাটকলমালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পাটকলগুলোতে এখন দুই ধরনের পাটের বস্তা তৈরি হচ্ছে। যে বস্তা রপ্তানি হয়, তার দাম ৬০-৭০ টাকা। আর দেশি চাহিদা মেটাতে তৈরি হওয়া বস্তার দাম ৪২-৪৫ টাকা। অন্যদিকে একই ওজন বহনে সক্ষম প্লাস্টিকের বস্তা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় ১৫-২০ টাকায়। সে কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে প্লাস্টিকের বস্তা বেশ জনপ্রিয়।
নওগাঁর একটি বড় চালকল সুলতানপুরের সুরমা রাইস মিলে এখনো প্লাস্টিকের বস্তাতেই চাল বিপণন হচ্ছে। জানতে চাইলে এর স্বত্বাধিকারী আকবর মোল্লা বলেন, ‘৫০ কেজির একটি পাটের বস্তার দাম ৮০ টাকা। আর প্লাস্টিকের বস্তার দাম ২০ টাকা। এখন যদি পাটের বস্তায় চাল দিতে হয়, তাহলে প্রতি বস্তায় কেজিতে এক টাকা ১০ পয়সা করে দাম বাড়বে। এটা তো ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলবে। উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়টাও সরকারকে দেখতে হবে।’
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সরকার বাধ্য করলে আমরা পুরোপুরিই পাটের বস্তায় চাল দেব। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত পাটের বস্তার দাম কমানো এবং প্রয়োজনমতো বস্তা সরবরাহ করা।’
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) হিসাব করে দেখেছে, খাদ্যশস্য, সার ও চিনি মোড়কীকরণ করতে বছরে ৫০-৫৫ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন হবে। আর বিজেএমসি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) বছরে ৫৫-৬০ কোটি পাটের বস্তা তৈরির ক্ষমতা আছে। কিন্তু ব্যবহার নেই বলে সেই পরিমাণ বস্তা এখন তৈরি হয় না।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ুন খালিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা (বিজেএমসি) এখন বছরে ২০-২৫ কোটি বস্তা উৎপাদন করছি। আমরা একাই ৪০ কোটি বস্তা পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারব। কিন্তু উৎপাদন করছি না। কারণ, আমরা বস্তা নিয়ে বসে আছি, কেউ কিনছে না।’ আইন কড়াকড়িভাবে পালনে বাধ্য করতে সরকারকে অনুরোধ করেন তিনি।