জাহাজ পরিচালনা ব্যবসায় পিছিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা

বছরে প্রায় পাঁচ কোটি মেট্রিক টন আমদানি-রপ্তানি পণ্য এখন সমুদ্রপথে পরিবহন হয়। প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে পণ্য পরিবহনের হার। তবে এসব পণ্যের প্রায় পুরোটাই আনা-নেওয়া হচ্ছে বিদেশি মালিকানাধীন জাহাজে। সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনা ব্যবসায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ তৈরি হওয়ায় এই খাতে পণ্য পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে।
উদ্যোক্তারা জানান, কয়েক বছর ধরে মন্দার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ভাড়া কমে গেছে। কিন্তু জাহাজ পরিচালনার খরচ বেড়েছে। আবার এ ব্যবসায় টিকে থাকতে হয় বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদসহ দেশীয় নানা প্রতিবন্ধকতা। এর পরও মন্দা কেটে যাবে এমন আশায় জাহাজ পরিচালনা ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছিলেন অনেকে। তবে জাহাজ ব্যবসায় মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে এখন অনেকেই এই ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের সমুদ্রগামী জাহাজ মালিক সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ আলম প্রথম আলোকে জানান, জাহাজ নিবন্ধনে এখনো প্রতিবন্ধকতা অনেক। পোশাকশিল্পের মালিকেরা বিদেশি মুদ্রা আয় করলে উল্টো তাদের নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। অথচ জাহাজের ভাড়াবাবদ বিদেশি মুদ্রা দেশে আনার পর ৩ শতাংশ কর দিতে হয়। আবার বিদেশের কোনো বন্দর থেকে জাহাজ কেনার পর শুল্কায়নের আগে পণ্য পরিবহন করা যায় না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে এখানে সুদের হারও বেশি। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর না করলে নতুন করে জাহাজ নিবন্ধনে কেউ আগ্রহী হবে না। তাই বছরে জাহাজ ভাড়াবাবদ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
দেশীয় জাহাজ ৬৮ থেকে ৪০: নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর এবং উদ্যোক্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের আগে সরকারি-বেসরকারি দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ছিল ২৪টি। সমুদ্রগামী জাহাজ নিবন্ধন সহজীকরণ ও শুল্ককর কমানোর কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা জাহাজ কেনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকেরা পরিবহনে খরচ সাশ্রয় করতে যুক্ত হন এই খাতে।
হিসাবে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশীয় বহরে যুক্ত হয় ৪১টি সমুদ্রগামী জাহাজ। এরপর ২০১২ সালের জুনে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা উন্নীত হয় ৬৮টিতে। ২০১৩ সালে নয়টি জাহাজ নিবন্ধন নেন উদ্যোক্তারা। চলতি বছর এ পর্যন্ত মাত্র একটি জাহাজ নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে।
তবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে সমুদ্রগামী জাহাজ ব্যবসা থেকে সরে আসতে থাকেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। খরচ পোষাতে না পেরে অনেকেই পুরোনো জাহাজগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেন। দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ৪৮টিতে। তবে নিয়মিত পণ্য পরিবহন করছে এমন জাহাজের সংখ্যা ৪০টি। জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮টি থেকে কমে এখন ১৫টিতে হয়েছে।
জানতে চাইলে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের মুখ্য কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, বিশ্বমন্দার সময় জাহাজের দাম কমে যাওয়ায় অনেকেই এই খাতে যুক্ত হয়েছিলেন। মন্দা এখনো কাটেনি। আবার অভিজ্ঞতার অভাবে অনেকে এ ব্যবসা পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এসব কারণে জাহাজ নিবন্ধনের সংখ্যা কমে গেছে।
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের সাবেক মুখ্য কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, দেশীয় বহরে থাকা জাহাজের ৯০ শতাংশেরই গড় বয়স এখন ২৮ বছরের ঊর্ধ্বে। এসব জাহাজের বাণিজ্য বিস্তৃতি প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সীমিত পরিধির মধ্যে বাণিজ্য ভাড়া খুবই, যে কারণে খরচ তুলে আনা কঠিন।
পুরোনোদের কেউ নেই: উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি খাতে জাহাজের মালিকানা ও পরিচালনা ব্যবসার ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। প্রায় ৩৭ বছর আগে সমুদ্রগামী জাহাজের ব্যবসায় প্রথম যুক্ত হন তৎকালীন মাসরিকি জুটমিলের স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী খন্দকার মাহতাব উদ্দিন। দুটি জাহাজই ছিল বিদেশি পতাকাবাহী। তবে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের পথিকৃৎ এটলাস শিপিং লাইনস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানাউল্লাহ চৌধুরী। ১৯৭৮ সালে প্রায় ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ‘এমভি আল সালমা’ জাহাজ নিবন্ধনের মাধ্যমে এই ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে এই প্রতিষ্ঠানের বহরে যোগ হয় আরও ছয়টি জাহাজ।
এরপর পর্যায়ক্রমে আবুল খায়ের চৌধুরীর সমুদ্রযাত্রা শিপিং, ওয়াসিউর রহমান চৌধুরীর একুয়াটিক শিপিং, আবদুল আউয়াল মিন্টুর (সিংহভাগ অংশীদার) বেঙ্গল শিপিং এবং শাহ আলমের কন্টিনেন্টাল লাইনার এজেন্সি যুক্ত হয় এই খাতে। এসব কোম্পানির মধ্যে এখন শুধু কন্টিনেন্টাল লাইনার এজেন্সির জাহাজের মালিকানার ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজের মালিকানা ব্যবসা থেকে সরে এসেছে।
জানতে চাইলে ওয়াসিউর রহমান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জাহাজ ব্যবসায় বিশ্বমন্দার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ি। এ কারণে সর্বশেষ ২০০০ সালের দিকে পারিবারিকভাবে আমরা জাহাজের মালিকানা ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিই। তবে এখন শিপিং এজেন্সি, চার্টারিংসহ অন্যান্য ব্যবসায় যুক্ত আছি।’
কনটেইনার জাহাজ-শূন্য: দেশীয় জাহাজ বহরে কনটেইনারবাহী জাহাজ নেই একটিও। ফলে সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহন এখন চলছে বিদেশি কোম্পানির জাহাজের মাধ্যমে। গত বছর সমুদ্রপথে ১৬ লাখ ৬৮ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয় বিদেশি জাহাজে।
কনটেইনার জাহাজ পরিচালনায় কিউসি শিপিং এবং এইচআরসি শিপিং এগিয়ে এলেও দুটি কোম্পানির এখন কোনো জাহাজ সচল নেই। দেশীয় পতাকাবাহী কিউসি শিপিং লাইনসের দুটি এবং এইচআরসি শিপিং লিমিটেডের আটটি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে এইচআরসি শিপিং লিমিটেডের সর্বশেষ চারটি জাহাজ স্ক্র্যাপ (বাতিল) হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এইচআরসি শিপিং লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক এস এম মাহফুজুল হক প্রথম আলোকে জানান, পণ্য পরিবহনের ভাড়ার চেয়ে জাহাজ পরিচালনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এইচআরসির বহরে থাকা সর্বশেষ চারটি কনটেইনার জাহাজ স্ক্র্যাপ করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই খাতে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হবেন।
সরকারি জাহাজও কমছে: স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জুনে ‘এমভি বাংলার দূত’ জাহাজ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এ দেশে জাহাজে পণ্য পরিবহন ব্যবসায় যাত্রা শুরু করে। ১৯৮২ সালের মধ্যে ২৭টি জাহাজ যোগ হয় এই সংস্থার বহরে। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা ৩৮টিতে উন্নীত হয়। তবে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় ২৫টি জাহাজ পরিত্যক্ত হয়। ১৯৯১ সালের পর এই সংস্থার বহরে নতুন কোনো জাহাজ যুক্ত হয়নি। বরং এই সংস্থার বহরে থাকা জাহাজ ১৩টি থেকে কমে এসেছে আটটিতে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এসব জাহাজ পণ্য পরিবহন হয় মাত্র এক লাখ টন।
জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মকসুমুল কাদের প্রথম আলোকে জানান, বিএসসির বহরে থাকা জাহাজগুলোর গড় বয়স অনেক বেশি। এ কারণে এখন নতুন করে ছয়টি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।