ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুয়েল গেজ রেলপথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এতে মিটার ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের রেলগাড়িই চলবে। এর ফলে দেশের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ এবং পূর্বাঞ্চলে মিটারগেজ রেলপথ রয়েছে। এতে পশ্চিমাঞ্চলে রেলগাড়ি পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে না। ডুয়েল গেজ হলে চট্টগ্রাম থেকে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি যাত্রী ও পণ্য চলাচল করতে পারবে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে কুমিল্লার লাকসাম পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার ডবল লাইন নির্মাণের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকে উত্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি পাস না করে নতুন করে পরিকল্পনার নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডবল লাইন নির্মাণের পাশাপাশি ডুয়েল গেজ করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৩২০ কিলোমিটার বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথের পুরোটাই ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হবে।
আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্পটি সংশোধন করে প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একনেক সভায়।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ হলে পার্শ্ববর্তী ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করাও সম্ভব হবে। এসব দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্রডগেজ রেলপথ রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের যেকোনো স্থানে এবং পার্শ্ববর্তী দেশেও সরাসরি পণ্য পরিবহন করা যাবে। ইতিমধ্যে ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সঙ্গে ট্রানজিট দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডবল রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেললাইনের মানোন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। ছয় বছরের এই প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়ন করার কথা রয়েছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এই প্রকল্পের ব্যয় ও সময় কত বাড়তে পারে, সে সম্পর্কে রেল মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ধারণা দিতে পারেননি। তবে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকাল নির্ভর করবে দাতাসংস্থাগুলো কীভাবে অর্থায়ন করছে, তার ওপর। এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় নকশায় সরকার প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখছে, সেটাও একটি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। মোটা দাগে বলা চলে, এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন বেশ সময়সাপেক্ষ ও জটিল।
সংশোধিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই ডবল ট্র্যাকে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত ডবল ট্র্যাক লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া এবং ফেনী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডবল ট্র্যাক বিদ্যমান রয়েছে।
গতকালের একনেক সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ডবল ট্র্যাক নির্মাণের সময় তা ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হলে সময় ও খরচ সাশ্রয়ী হবে। ডুয়েল গেজ হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আর মিটারগেজ লাইন নির্মাণ করা হবে না।
অন্য প্রকল্প: এই প্রকল্পটি পাস না হলেও একনেকে মোট চারটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে এক হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। পুরোটাই নিজস্ব অর্থায়নে জোগান দেওয়া হবে।
একনেক সভায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার চট্টগ্রাম জোনের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালের জুন মাসের মধ্যে দুই হাজার ৩১০ কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরি করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আরও পাঁচ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছয় লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক রয়েছে।
গতকাল অনুমোদিত অন্য তিনটি প্রকল্প হলো ৫৬৪ কোটি টাকার পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর) প্রকল্প, ৭৩ কোটি টাকার সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্প এবং ৩৬ কোটি টাকার নড়াইল জেলার সদর উপজেলাধীন পুরোনো ফেরিঘাটসংলগ্ন চিত্রা নদীর ওপর ১৪০ মিটার ব্রিজ এবং ১৪০ মিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণ প্রকল্প।