দাম কমিয়েও সাড়া নেই পাটের বস্তায়

.
.

আইন করে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও যখন খাদ্যশস্য, বিশেষ করে ধান ও চাল বিপণনে ব্যবসায়ীদের বাধ্যতামূলকভাবে পাটের বস্তা ব্যবহার করানো যাচ্ছে না, তখন কম দামে বাজারে বস্তা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)।
ইতিমধ্যে ২৫ হাজার পাটের বস্তা উৎপাদন করে তা বিক্রিও করেছে সংস্থাটি। এসব বস্তা উৎপাদনে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা ব্যয় হলেও বিক্রি করা হচ্ছে ৩২ টাকায়।
পাটের বস্তা ব্যবহার না করার পেছনে চালকলমালিকদের বড় যুক্তি হলো, পাটের বস্তার দাম প্লাস্টিকের বস্তার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি। সে দিকটি বিবেচনায় নিয়েই কম দামে পাটের বস্তা বাজারে সরবরাহের এই সিদ্ধান্ত নেয় বিজেএমসি। কিন্তু এতেও ব্যবসায়ীদের সাড়া পাচ্ছে না সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ুন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের ভেতরে পাটের বস্তার যে বিশাল বাজার রয়েছে, সেটা ধরতেই আমরা কম দামে বস্তা তৈরির উদ্যোগটি নিয়েছি এবং উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে তা বিক্রি করছি। কিন্তু তেমন সাড়া পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, বিজেএমসি তাদের বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরকার বাধ্য করলে আমাদের পাটের বস্তা ব্যবহার করতেই হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দামটা আরও সহনীয় করা, সরবরাহ নিশ্চিত ও তা সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে চটের বস্তায় যেন ঠিকমতো ব্র্যান্ডিং করা যায়, সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। নইলে চালের মান ধরে রাখা যাবে না।’
২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সরকারিভাবে ধান, চাল ও গম বাজারজাত করার ক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তর শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করে। কিন্তু চালকলমালিকেরা আইনটি উপেক্ষা করে আসছিলেন। সে কারণে ধান ও চালের মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে পাট মন্ত্রণালয়। এতে এ বছরের প্রথম দিন থেকে ধান-চাল শুধুই পাটের বস্তায় বিপণন করতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
চালকলমালিকেরা এই নির্দেশও উপেক্ষা করেছেন। একই সঙ্গে এর বিরুদ্ধে আদালতে রিটও করেন তাঁরা। ওই রিট স্থগিত করলে পাট মন্ত্রণালয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু করে। এখনো তা চলমান আছে।
এত কিছুর পরও ধান-চাল পরিবহন হচ্ছে প্লাস্টিকের বস্তায়। এর পেছনে চালকলমালিকেরা দুটি যুক্তি দেন। প্রথমত, পাটের বস্তার দাম বেশি। দ্বিতীয়ত, এই বস্তা সহজলভ্য নয়। তাঁদের যত বস্তা দরকার, সে পরিমাণ সরবরাহ করতে পারেন না পাটকলমালিকেরা।
পাটকলমালিকেরা জানান, পাটকলগুলোতে এখন দুই ধরনের পাটের বস্তা তৈরি হচ্ছে। যে বস্তা রপ্তানি হয়, তার দাম ৬০ থেকে ৭৫ টাকা। আর দেশীয় চাহিদা মেটাতে তৈরি হওয়া বস্তার দাম ৪২ থেকে ৫০ টাকা। অন্যদিকে একই ওজন বহনে সক্ষম প্লাস্টিকের বস্তার দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছে প্লাস্টিকের বস্তাই জনপ্রিয়।
বিজেএমসির বিপণন বিভাগ সূত্র বলছে, তারা গত মাসে হেসিয়ান ক্লথ দিয়ে ৫০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম একটি পাটের বস্তা বানানো শুরু করে। টাঙ্গাইলের একজন ব্যবসায়ী ২৫ হাজার বস্তার কার্যাদেশ দেন। সে অনুযায়ী ওই বস্তা তৈরি করে তাঁর কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এর পর থেকে অনেক চালকলমালিক ও ব্যবসায়ী এ বস্তা কেনায় আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত আর কিনছেন না।
হুমায়ুন খালেদ বলেন, ‘দেশের যেকোনো অঞ্চলের ব্যবসায়ীদেরই আমরা পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এই বস্তা সরবরাহ করতে সক্ষম। কিন্তু অর্ডার নেই বলে আমরা এ বস্তার উৎপাদনও বন্ধ রেখেছি।’ তিনি জানান, বর্তমানে বিজেএমসির কাছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার বেল অবিক্রীত পাটের বস্তা জমে আছে, যার মূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
বিজেএমসির আওতায় ২৬টি পাটকল থাকলেও ২৩টিতে পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এসব পাটকলে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বস্তার উৎপাদনই ৪০০ টনের বেশি।
বিজেএমসির হিসাবে, দেশের খাদ্যশস্য, সার ও চিনি মোড়কীকরণ করতে বছরে ৫০ থেকে ৫৫ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন হবে। বিজেএমসি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত (বিজেএমএ) মিলগুলোর বছরে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি বস্তা তৈরির সক্ষমতা আছে। বিজেএমসির মিলগুলোরই ৩০ থেকে ৪০ কোটি বস্তা উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু ব্যবহার নেই বলে ওই পরিমাণ বস্তা এখন তৈরি হয় না।