ধানের সঙ্গে ‘ফ্রি’ ২৫০ কোটি টাকার খড়

রাজশাহীতে চাষিরা গেল রোপা-আমন মৌসুমে ধানের দাম পেয়েই খুশি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধানের খড়ের বাড়তি দাম। গত বছরের তুলনায় ধানের খড়ের দাম বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, এবার রাজশাহীর চাষিরা ধানের সঙ্গে পেয়েছেন প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বেশি খড়। দাম আরও বাড়ার আশায় চাষিরা ধানের মতোই মজুত করছেন খড়। চাষিদের বাড়িতে বাড়িতে এখন খড়ের গাদা তৈরির ধুম পড়ে গেছে। শুধু প্রান্তিক চাষিরা পরবর্তী ফসলের খরচ জোগাড় করার জন্য খড় বিক্রি করছেন। চাষির বাড়ি থেকে ব্যবসায়ীরা সে খড় শহরে এনে এখনই প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গেল রোপা-আমন মৌসুমে জেলায় ৭৭ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ১ হেক্টর সমান ৭ দশমিক ৪৭ বিঘা। এক বিঘা জমির ধানের খড় কৃষকের বাড়ি থেকেই বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার টাকায়। সেই হিসাবে রাজশাহীর ধানচাষিরা ধানের সঙ্গে পেয়েছেন ২৬১ কোটি ৭৯ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকার খড়।

এবার ধান চাষের খরচ খড় বিক্রি থেকেই প্রায় উঠে আসছে।
কৃষক আনসার আলী

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, রাজশাহীর ব্রি-৫১ স্বর্ণা ধানের খড় খুব ভালো হয়। এই খড় প্রধানত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের অনেক জায়গায় বন্যা হওয়ার কারণে খড় নষ্ট হয়ে গেছে। এবার আউশ মৌসুমে অতিবর্ষণের কারণেও খড় নষ্ট হয়েছে। এই অবস্থায় খামারিরা যেখান থেকে পারছেন, খড় সংগ্রহ করছেন। এ জন্য চাহিদা বেড়েছে। দামও বেড়েছে। এবার ধান ও খড়—দুটোই লাভজনক।

খড়ের বাজার জানার জন্য গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী শহর থেকে জেলার সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনকারী এলাকা তানোর ও গোদাগাড়ীতে গিয়ে ধানের খড় নিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মাতামাতি দেখা গেছে। রাজশাহী শহর থেকে জেলার পবা উপজেলার বায়া, বাগধানী, তানোরের কালীগঞ্জ হয়ে গোদাগাড়ীর প্রসাদপাড়া গ্রামে যেতে যেতে দেখা যায়, সারি সারি ভটভটিতে বোঝাই করে ব্যবসায়ীরা ধানের খড় রাজশাহী শহরের দিকে নিয়ে আসছেন। বাগধানী বাজারে একসঙ্গে পাঁচটি খড়ের গাড়ি পাওয়া যায়।

ব্যবসায়ীরা গাড়ি থামিয়ে চা খাচ্ছিলেন। সেখানে কথা হয় তানোরের হারদো গ্রামের ব্যবসায়ী বাহারাম খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, একটি ভটভটিতে ২ হাজার ৪০০টি খড়ের আঁটি রয়েছে। শহরের খামারিদের কাছে তিনি এই খড় ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করবেন। সেই হিসাবে এক আঁটি খড়ের দাম পড়বে পাঁচ টাকা।

প্রসাদপাড়া গ্রামের চাষি রুহুল আমিন হিসাব দিলেন, ১ বিঘা জমিতে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ আঁটি খড় হয়ে থাকে। এই খড় এখন মাঠ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি আঁটি খড়ের দাম পড়ছে ২ টাকা ৫০ পয়সা। গ্রাম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে শহরে এনে এখনই এই খড় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

এই গ্রামের কৃষক জয়নাল সরকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় দুটি বিশাল খড়ের গাদা তৈরি করা হচ্ছে। জয়নাল সরকার বলেন, গতবার ১ বিঘা জমির খড় বাড়ি থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার সেই খড়ের দাম উঠেছে সাড়ে চার হাজার টাকা। তিনি তাঁর ৪০ বিঘা জমির ধানের খড়ের ১ আঁটিও বিক্রি করেননি। তিনি বলেন, বর্ষা আসতে না আসতেই সাড়ে ৪ হাজার টাকার খড় ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে। এ জন্য গাদা করে রেখে দিচ্ছেন।

কিষানি মেহেরুন্নেসা বলেন, তিনি তাঁর সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ধান করেছিলেন। সব খড়ই তিনি গাদা করে রেখে দিয়েছেন। কিছুটা নিজের গরুকে খাওয়াবেন আর বাকিটা দাম বাড়লে বিক্রি করবেন। কৃষক আনসার আলী বলেন, এবার ধান চাষের খরচ খড় বিক্রি থেকেই প্রায় উঠে আসছে।