নগদ ভাড়া নিয়ে ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে পারবেন বাড়িওয়ালারা

বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে যথাযথ কর আদায়ে অনেক হাঁকডাক করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরে বাড়িওয়ালাদের ওপর প্রায় দেড় বছর ধরে জরিপও করা হয়েছে। আর বাড়িওয়ালাদের কর ফাঁকি রোধে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে বাড়িভাড়া চেকের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে নেওয়া বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। ঘোষণাটি ছিল, মাসে মোট ২৫ হাজার টাকার বেশি বাড়িভাড়া পেলেই পৃথক ব্যাংক হিসাবে বাড়িওয়ালাকে ভাড়ার টাকা নিতে হবে।
কিন্তু এই ঘোষণার প্রায় দেড় মাস পরে এনবিআরের জারি করা পরিপত্রে দেখা গেল, চেকের মাধ্যমে ভাড়ার অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি নগদ নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। শুধু বাড়িভাড়ার অর্থ ব্যাংক হিসাবে বাড়িওয়ালা নিজেই রাখবেন। বাড়িওয়ালা চাইলে ভাড়াটের কাছ থেকে নগদ অর্থ নিয়ে তা তাঁর ওই ব্যাংক হিসাবে রাখতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এর ফলে পুরো ব্যবস্থায় ফাঁকটি থেকেই গেল। আবার পৃথক ব্যাংক হিসাবে ভাড়া নেওয়ার কথা থাকলেও সেখান থেকে সরে এসেছে এনবিআর। একই হিসাবে অন্য খাত থেকে আয়ের পাশাপাশি বাড়িভাড়ার অর্থও রাখতে পারবেন বাড়িওয়ালা। ফলে বাড়িওয়ালাদের আর নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে না।
গতকাল মঙ্গলবার বাড়িভাড়া পরিশোধের পদ্ধতিসংক্রান্ত বিধিমালা জারি করেছে এনবিআর। এই বিধিমালাটি আয়কর বিধিমালায় ৮এ নামে নতুন বিধি হিসেবে সংযোজন করা হয়েছে।
এই বিধিমালা অনুযায়ী, বাড়িভাড়ার অর্থ নেওয়ার জন্য তিনটি পন্থা বলা হয়েছে। প্রথমত, ভাড়াটে ক্রস চেক্রের মাধ্যমে বাড়িওয়ালার ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দিতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বাড়িওয়ালার ব্যাংক হিসাবে ভাড়ার অর্থের সমপরিমাণ নগদ অর্থ জমা রাখতে পারবেন। তৃতীয়ত, বাড়িওয়ালা চাইলে ভাড়াটের কাছ থেকে ভাড়ার অর্থ নগদ নিতে পারবেন, তবে পরে সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে পারবেন।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাড়িভাড়া থেকে কর আদায় প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। তাই প্রথম দিকে কিছুটা শিথিলভাবে এটি করা হচ্ছে। পৃথক ব্যাংক হিসাবের জন্য বাড়তি খরচ বহন করতে হয়। ভাড়াটেদেরও সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আর আগামী ২০১৫-১৬ করবর্ষ থেকে আয়কর বিবরণীতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
তবে ভাড়াটের কাছ থেকে ভাড়ার অর্থ নগদ নিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য কম অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে পারেন। যেমন একজন বাড়িওয়ালা মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া পান। ভাড়াটের কাছ থেকে মাস শেষে সেই অর্থও বুঝে নেন। কোনো রশিদ দেন না। কিন্তু ওই বাড়িওয়ালা যদি তাঁর ব্যাংক হিসাবে মাসে ৩০ হাজার টাকা রাখেন, তবে তিনি প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকার আয় গোপন করবেন। এতে বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা আয় গোপন করা হবে। ফলে এই টাকার ওপর আরোপিত কর ফাঁকি দিলেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর শাহজাহানপুরের তিনতলা বাড়ির মালিক আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে জানান, ‘এনবিআরের উদ্যোগটি খুবই ভালো। সৎ বাড়িওয়ালা করদাতারা করদানে উৎসাহিত হবেন। কিন্তু কর ফাঁকির সুযোগটি নেবেন দুষ্টু বাড়িওয়ালারা। এতে ভাড়াটেরা ন্যায়বিচার পাবেন না। তাঁদের কষ্টের অর্থ রাষ্ট্রের কাজে লাগবে না।’
তবে এনবিআরের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত রেজিস্টার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে ভাড়াটের তথ্য, ঠিকানা, ভাড়া দেওয়ার তারিখ ও পরিমাণ ইত্যাদি সংরক্ষণ করতে হবে। তবে ভাড়াটেকে ভাড়া বাবদ রশিদ প্রদানের কথা বলা হয়নি।
বাড়িওয়ালারা সঠিকভাবে এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করছেন কি না, এনবিআরের পক্ষে কতটা তদারকি করা সম্ভব, এমন প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে উপ-কর কমিশনাররা বিষয়টি সব সময়েই তদারকিতে রাখবেন। এ ছাড়া বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত তথ্যে অসংগতি প্রমাণিত হলে উপ-কর কমিশনারের ওই করদাতার বাড়িভাড়া বাবদ প্রাপ্ত আয়ের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা রয়েছে।’
উল্লেখ্য, আয়কর অধ্যাদেশের ২(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো করদাতার বাড়িভাড়া হতে প্রাপ্ত অর্থ যদি যুক্তিসংগত না হয়, তবে কর কর্মকর্তা ওই এলাকার সমতুল্য অন্য বাড়িভাড়া মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ওই করদাতার বাড়িভাড়া বাবদ আয় নির্ধারণ করতে পারবেন।
এদিকে কোনো বাড়িওয়ালা যদি ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সঠিকভাবে ব্যাংক হিসাবে জমা না রাখেন কিংবা গোপন করেন, তবে এনবিআর ওই বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করতে পারবে। ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া জমা না নিলে কিংবা আংশিক ভাড়া ব্যাংকের মাধ্যমে নিলে ওই বাড়িওয়ালার বাড়িভাড়া বাবদ প্রকৃত আয়ের ওপর প্রদত্ত করের ৫০ শতাংশ বা ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা (যেটি বেশি হবে) জরিমানা করা হবে। এর মানে হলো, বাড়িভাড়ার আয় গোপন করলে গোপন করা অর্থের ওপর কর দেওয়ার পাশাপাশি জরিমানাও দিতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বাড়িওয়ালারা কর নথিতে বাড়িভাড়া থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত আয় দেখান না। প্রতি মাসে যত টাকা ভাড়া হিসেবে পান, বছর শেষে কর নথিতে এর অর্ধেক দেখান। মূলত কর ফাঁকি দিতেই অনেক বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া থেকে আয় কম দেখান। এটাই সহজ প্রক্রিয়া। কেননা কোন কোন ভাড়াটে কত টাকা দিলেন, এর কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। এখন থেকে ব্যাংক হিসাবে ভাড়ার টাকা জমা রাখা হলে বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দেওয়ার সময় সেই হিসাবের লেনদেন বিবরণী জমা দিতে হবে। সেই হিসাবের লেনদেন মিলিয়ে দেখবেন কর কর্মকর্তারা।
২০১৩ সালের শেষ দিকে বাড়িওয়ালাদের ওপর জরিপ চালানো শুরু করে এনবিআর। কোন বাড়িওয়ালার কর শনাক্তকরণ নম্বর আছে, কোন বাড়িওয়ালার তা নেই—এটা ছিল জরিপের উদ্দেশ্য। গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এক লাখ ৬২ হাজার টিআইএন নেই, এমন বাড়িওয়ালার সন্ধান পেয়েছে এনবিআর। এসব বাড়িওয়ালাকে টিআইএন নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া শুরু করেছে এনবিআর।